মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আব্দুল মতিনের (৮১) জানাজা রাষ্ট্রীয় সম্মানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) সকাল ১১টায় কুলাউড়া পৌর শহরের নবীন চন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় বর্তমান সংসদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের দুই সহস্রাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। জানাজার আগে মরদেহ বিদ্যালয় মাঠে আনা হলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আনিসুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রশাসনের একটি দল রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের পর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন কুলাউড়া উপজেলার সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু, উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল, সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল জলিল জামাল, সাবেক আহ্বায়ক রেদওয়ান খান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর মজলিসে শূরা সদস্য রাজানুর রহিম ইফতেখার, নায়েবে আমির জাকির হোসেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসম কামরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মইনুল ইসলাম শামীম, জেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জামাল উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খুরশিদ উল্লাহ, পৌর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল ইসলাম, কুলাউড়া সমিতি ঢাকার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন, জয়চণ্ডী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রব মাহাবুব, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সুশীল চন্দ্র দে এবং মরহুমের ছেলে আরাফাত মো. মুজিবসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
পরে বেলা ২টায় উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের হযরত বিবিমাই (রহ.) মোকামে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সেখানকার পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন আব্দুল মতিন। সোমবার (১ জুন) দুপুর ১২টার দিকে ঢাকার মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৪৫ সালের ১৭ মার্চ কুলাউড়া উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের কামারকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল মতিন। সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিক অল্প বয়সেই জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।
জয়চণ্ডী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে টানা পাঁচবার নির্বাচিত হয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পরবর্তীতে দুইবার কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রাজনীতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন। সহকর্মীদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেম তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও প্রতিফলিত হয়েছিল।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় রাজনীতির প্রচলিত হিসাব-নিকাশের বাইরে তাঁর এ বিজয় স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। রাজনৈতিক সমঝোতা ও সাংগঠনিক ঐক্যের স্বার্থে নেওয়া এ সিদ্ধান্তও সে সময় আলোচিত হয়েছিল।
রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ সময়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত সৌজন্য, সহজ-সরল জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন মহলে তিনি সম্মানিত ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর কুলাউড়া ও মৌলভীবাজারজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাজনৈতিক কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ তাঁর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য পর্যন্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আব্দুল মতিন নিজেকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে কুলাউড়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও জননেতা হিসেবে তাঁর অবদান স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আপনার মতামত লিখুন :