জনতার অশ্রুসিক্ত বিদায়ে ভোলায় মায়ের পাশে চিরনিদ্রায় তোফায়েল আহমেদ

রিয়াজ ফরাজী , বোরহানউদ্দিন (ভোলা) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০২ জুন, ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

প্রবীণ রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র তোফায়েল আহমেদকে শেষ বিদায় জানাতে তার জন্মভূমি ভোলায় মানুষের ঢল নেমেছে।

মঙ্গলবার (২ জুন) জোহরের নামাজের পর ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সর্বস্তরের হাজারো মানুষ অংশ নেন।

জানাজায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা ভুলে সবাই বর্ষীয়ান এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এর আগে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে তার মরদেহ ভোলায় পৌঁছায়। জানাজার আগে মাঠসংলগ্ন এলাকায় ছাত্রদল ও যুবদলের কিছু নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল করলেও জ্যেষ্ঠ নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হয়ে আসে।

জানাজা শেষে তার মরদেহ ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবা ও প্রয়াত স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। এ সময় স্বজন, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জানান।

সোমবার (১ জুন) ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তোফায়েল আহমেদ। তার মৃত্যুতে ভোলাসহ সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।

তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তিনি ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর অন্যতম নেতা ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন এবং একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ভোলা-১ আসন থেকে বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

সততা, স্পষ্টভাষিতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে সম্মানিত ছিলেন। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন দক্ষ সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নেতা এবং গণমানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক দলের নেতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ভোলাবাসী তাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে শোকাহত হলেও তার কর্মময় জীবন ও অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

 

Link copied!