ডিআইজি-এসপিদের কর্মকাণ্ডে কড়া নজরদারি, বাড়ছে বদলি ও প্রত্যাহার

রেজাউল করিম রেজা , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৬ জুন, ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি) ও রেঞ্জ ডিআইজিদের কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারের নজরদারি সম্প্রতি আরও জোরদার হয়েছে। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর পৃথকভাবে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ডিআইজি/ এসপিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি রেঞ্জের ডিআইজি/ জেলার পুলিশ সুপারের কর্মদক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক আচরণ নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। কোনো ডিআইজি/এসপির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত এক মাসে চার জেলার পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপার মো. মাহফুজ আফজালকে প্রত্যাহার করা হয়। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত আদেশে তাকে জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ৫ জুনের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হয়।

মাত্র ছয় মাস আগে ঝিনাইদহের এসপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মাহফুজ আফজালের সময়ে জেলায় দুটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা এবং সর্বশেষ ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যদিও প্রত্যাহারের আদেশে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

অন্যদিকে ময়মনসিংহ অঞ্চলের চার জেলা—ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনায় ওসি পদায়ন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রভাবশালী ছিলেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন থানায় পদায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানায় মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দুই ওসির পদায়ন ও প্রত্যাহারের ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলমাকান্দা থানাকে ঘিরে ঘুষ, অনিয়ম ও পেশাগত আচরণবিষয়ক বিভিন্ন বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে।

সূত্র দাবি করছে, চার জেলায় অন্তত ১৬ জন ওসির সাম্প্রতিক পদায়ন নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও প্রশ্ন উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে পুলিশ প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে খুব শিগগিরই ময়মনসিংহ অঞ্চলের দুই পুলিশ সুপার এবং একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বদলি হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।

একের পর এক প্রত্যাহার, বাড়ছে আলোচনা: এর আগে ফেনী, পঞ্চগড় ও মৌলভীবাজার জেলার এসপিদেরও প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। তারা হলেন ফেনীর মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান, পঞ্চগড়ের মো. মিজানুর রহমান এবং মৌলভীবাজারের মো. রিয়াজুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি পুনর্গঠন, জনআস্থা ফিরিয়ে আনা এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ফলে এসপি প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপকে অনেকেই কঠোর জবাবদিহি ও শৃঙ্খলার বার্তা হিসেবে দেখছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়নের আগে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিষয়ে গোপন প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়। সেখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট কোনো মামলা বা অভিযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করা হয়। সবকিছু ইতিবাচক হলে তবেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এসপি পদে উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাড়ছে জবাবদিহি, তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা: বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। কোনো জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রশাসনিক অসন্তোষ কিংবা জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

তবে কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, ঘন ঘন প্রত্যাহার কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। প্রত্যাহারের কারণগুলো যদি স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা না করা হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ বাড়তে পারে।

পুলিশ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা বুঝতে পারছেন যে কোনো পদই স্থায়ী নয়। কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা ও জনআস্থার প্রশ্নে ব্যর্থ হলে দ্রুত বদলি বা প্রত্যাহারের ঝুঁকি রয়েছে। এতে একদিকে কর্মকর্তারা আরও সতর্ক হচ্ছেন, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণও শক্তিশালী হচ্ছে।

মৌলভীবাজারের সাবেক এসপিকে ঘিরে অভিযোগ: গত ১৪ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৌলভীবাজারের সাবেক পুলিশ সুপার মো. রিয়াজুল ইসলামকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগে বলা হয়, এসপি পদে নিয়োগ পেতে তিনি একজন তদবিরকারীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করেছিলেন। পরবর্তীতে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় বিরোধের সৃষ্টি হয়।

এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের আজীবন সদস্য হওয়ার অভিযোগও ওঠে। এসব বিষয় পুলিশ সদর দপ্তরের নজরে আসার পর গত ১৫ মে তাকে ১৬ মের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর জোর: সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা বলেন, পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের কারণগুলো স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা উচিত। যদি বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ বা গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তবে তার ভিত্তিতে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্মদক্ষতার নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ এবং জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক প্রত্যাহার ও নজরদারির মাধ্যমে সরকার মাঠপর্যায়ের পুলিশ প্রশাসনে জবাবদিহি, পেশাদারিত্ব এবং জনআস্থা প্রতিষ্ঠার বার্তা দিতে চাইছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement

Link copied!