বাংলাদেশ পুলিশ ( ২০২৬-২০৭৬) : নগর পুলিশিং ও মেগা সিটি চ্যালেঞ্জ: জনবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক পুলিশিং :-ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান , লেখক

প্রকাশিত: ০৭ জুন, ২০২৬, ০১:৫৪ পিএম

পর্ব-৬

নগরায়ণ, জনঘনত্ব ও নিরাপত্তা সংকট:

একবিংশ শতাব্দী নগরায়ণের শতাব্দী। বিশ্বব্যাপী মানুষ যখন উন্নত জীবনের আশায় গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটছে, তখন ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো মেগা সিটিগুলো পরিণত হচ্ছে অপরিসীম সম্ভাবনা ও ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের এক জটিল মিলনস্থলে। জনসংখ্যার অভাবনীয় ঘনত্ব, যানজট, বস্তি, ভাসমান মানুষের স্রোত, সাইবার অপরাধ, মাদক, রাজনৈতিক সমাবেশ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা সংকট এবং গ্যাং কালচার-এসব মিলিয়ে নগরজীবন এক অনিরাপদ উৎকণ্ঠার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বাস্তবতায়, গ্রামীণ বা ছোট শহরের জন্য তৈরি প্রচলিত পুলিশিং মডেল মেগা সিটির জটিল রোগের কার্যকর ওষুধ হতে পারে না। প্রয়োজন এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির, যেখানে পুলিশি বাহিনী শুধু একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, বরং হবে একটি জনগণের নিকটবর্তী, প্রযুক্তিসমর্থিত, জবাবদিহিমূলক ও অংশীদারত্বভিত্তিক জনসেবা প্রতিষ্ঠান। মেগা সিটির নিরাপত্তা এখন কেবল অপরাধ দমনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি সামগ্রিক 'নগর শাসন' বা 'আরবান গভর্নেন্স'-এর অংশ হয়ে উঠেছে।

থানাকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে জনগণকেন্দ্রিক সক্রিয়তা:

প্রচলিত পুলিশিং মডেল মূলত প্রতিক্রিয়াশীল। এর মূল চরিত্র হলো অভিযোগ আসার পর ব্যবস্থা নেওয়া, মামলা রুজু করা এবং অপরাধী গ্রেপ্তার করা। থানাই এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু আধুনিক নগর পুলিশিংয়ের মূলমন্ত্র হলো সক্রিয়তা-অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের লক্ষ্যে জনগণের কাছে পৌঁছে যাওয়া, তাদের সমস্যা বোঝা এবং আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। এই দর্শনের বাস্তব রূপ হলো বিট পুলিশিং, ফুট প্যাট্রোল, নেইবারহুড পুলিশ অফিসার এবং কমিউনিটি লিয়াজোঁ অফিসার ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একজন পুলিশ সদস্য একটি নির্দিষ্ট মহল্লা, বাজার, স্কুল এলাকা বা বাসস্ট্যান্ডের দায়িত্বে থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। এই পরিচিতিই তৈরি করে অনানুষ্ঠানিক তথ্যের অমূল্য উৎস, যা দিয়ে অঙ্কুরেই বিনাশ করা যায় কিশোর গ্যাং, মাদকের আড্ডা বা পারিবারিক সহিংসতার মতো সমস্যা। এক্ষেত্রে পুলিশ কর্তৃপক্ষ তার অফিসারের কার্যক্রম তদারকি ও নিরাপত্তার জন্য বডি ওর্ণ ক্যামেরা ব্যবহার করতে হবে।

কমিউনিটি-ওরিয়েন্টেড পুলিশিং: অংশীদারত্বের নবতর দর্শন:

কমিউনিটি-ওরিয়েন্টেড পুলিশিং (সিওপি) হলো জনগণকেন্দ্রিক দর্শনের সর্বোৎকৃষ্ট প্রয়োগ। এটি পুলিশ ও জনগণের মধ্যে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলে। এ ধারণায় পুলিশ কোনো বহিরাগত "বাহিনী" (Force) নয়, বরং তারা সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য একটি "জনসেবা প্রতিষ্ঠান" (Public Service Institution)। এর আওতায় পুলিশ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, ব্যবসায়ী, যুবসমাজ, নারী সংগঠন ও নাগরিক কমিটির সাথে নিয়মিত বসে এলাকার নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) স্পষ্টতই বলেছে, কার্যকর পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি হলো জনআস্থা, আর এই আস্থা অর্জনের জন্য পুলিশি সততা ও দুর্নীতি-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যাবশ্যক। জনগণ যখন পুলিশকে নিজেদের লোক মনে করে, তখন তথ্য প্রদান থেকে শুরু করে অপরাধ দমনে সরাসরি সহযোগিতা-সবই সহজ হয়ে যায়।

প্রবলেম-ওরিয়েন্টেড পুলিশিং; উপসর্গ নয়, মূল কারণ চিহ্নিতকরণ:

সিওপি-র পরবর্তী ধাপ হলো প্রবলেম-ওরিয়েন্টেড পুলিশিং (পিওপি)। এর মূল কথা হলো, বারবার অপরাধী গ্রেপ্তার করে সমস্যার সাময়িক উপশম না করে, অপরাধের পেছনের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধান করা। মেগা সিটিতে যদি একটি নির্দিষ্ট গলিতে বারবার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, তবে শুধু টহল বাড়ালেই চলবে না। পুলিশকে খতিয়ে দেখতে হবে সমস্যার মূল কারণ: গলিটি কি অন্ধকার? সেখানে কি সিসিটিভির অভাব রয়েছে? গলির মুখে কি একটি সক্রিয় মাদক আড্ডা গড়ে উঠেছে, নাকি ওই এলাকার যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনক? পিওপি-র সমাধান তাই বহুমাত্রিক। এখানে পুলিশকে একক নায়ক না হয়ে সিটি করপোরেশনের সাথে আলো লাগাতে, পরিবহন কর্তৃপক্ষের সাথে স্টপেজ নির্ধারণ করতে এবং সমাজসেবা বিভাগ বা এনজিওর সাথে মিলে যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়। এক্ষেত্রে কাজের সুবিধার্থে একটি সমন্বিত "পিওসি কর্তৃপক্ষ" গঠন করে জন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

ন্যায়সংগত আচরণ (প্রসিডিউরাল জাস্টিস); আস্থার রসায়ন:

জনগণের সাথে পুলিশের প্রতিটি সংযোগস্থলই আস্থা তৈরি বা ভাঙার একটি সুযোগ। প্রসিডিউরাল জাস্টিস বা ন্যায়সংগত আচরণের তত্ত্বটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গবেষণায় দেখা গেছে, জনগণ পুলিশের সিদ্ধান্তের ফলাফল (যেমন জরিমানা বা গ্রেপ্তার) যতটা না গুরুত্ব দেয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় প্রক্রিয়াটিকে। অর্থাৎ, পুলিশ তাদের সাথে কেমন আচরণ করল, তা-ই মূল বিচার্য। জনগণ যখন মনে করে পুলিশ তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, সম্মানজনক আচরণ করেছে, কোনো পক্ষপাতিত্ব করেনি এবং সিদ্ধান্তের আইনি ব্যাখ্যা পরিষ্কার করে দিয়েছে, তখনই তারা পুলিশের প্রতি আস্থাশীল হয়। ওইসিডি-র সাম্প্রতিক ট্রাস্ট জরিপেও দেখা গেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো সেবাগ্রহীতার সাথে আচরণ, নীতির স্বচ্ছতা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একটি রূঢ় আচরণ পুরো থানার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে, আবার একটি মানবিক উচ্চারণ বিপুল আস্থার জন্ম দিতে পারে।

স্মার্ট পুলিশিং স্মার্ট সিটি ধারণা; প্রযুক্তির নৈতিক ও কার্যকর ব্যবহার:

মেগা সিটির জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তি এখন অপরিহার্য সঙ্গী। সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, জরুরি সেবা নম্বর (যেমন ৯৯৯), বডি-ওর্ন ক্যামেরা, ক্রাইম ম্যাপিং, প্রিডিক্টিভ অ্যানালাইসিস, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন জিডি, ডিজিটাল অভিযোগ ট্র্যাকিং এবং সমন্বিত কমান্ড কন্ট্রোল সেন্টার-এসবই স্মার্ট পুলিশিংয়ের হাতিয়ার। প্রযুক্তি পুলিশের চোখ-কানকে বহুগুণে প্রসারিত করে এবং সাড়া দেওয়ার গতি বাড়ায়। তবে এখানেই সতর্কতা জরুরি। প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে নৈতিক। নাগরিকের গোপনীয়তার সুরক্ষা (প্রাইভেসি প্রোটেকশন) ও তথ্যের জবাবদিহি (ডাটা অ্যাকাউন্টেবিলিটি) নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত নজরদারি যেন একটি ডিজিটাল প্যানোপটিকনে পরিণত হয়ে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে গ্রাস না করে, সে জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও তদারকি জরুরি। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকার বা বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থাগুলো যেভাবে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য, অবস্থান এবং আচরণের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে, তাকেই ডিজিটাল প্যানোপটিকন বলা হচ্ছে।

সুরক্ষা ও সহমর্মিতা; নারী, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীবান্ধব পুলিশিং:

মেগা সিটির নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর সুরক্ষা। নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী, পথশিশু, বস্তিবাসী, পোশাকশ্রমিক ও অভিবাসী জনগোষ্ঠী অনেক সময় ভয়, লজ্জা বা কাঠামোগত জটিলতায় পুলিশের কাছে সহজে যেতে পারে না। তাদের জন্য থানার পরিবেশ হতে হবে বন্ধুসুলভ ও সংবেদনশীল। এক্ষেত্রে নারী সহায়তা ডেস্ক ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারকে আরও শক্তিশালী করা, চাইল্ড-ফ্রেন্ডলি পুলিশিং নিশ্চিত করা, গণপরিবহনকে নারীর জন্য নিরাপদ করতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং পাট্রোল টিমে জেন্ডার-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ দেওয়া অপরিহার্য। ইউএন-হ্যাবিট্যাট তাদের নিরাপদ নগর নির্দেশনায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং তাদের জন্য পুলিশি সেবা সহজলভ্য করাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

মাল্টি-এজেন্সি আরবান সেফটি গভর্নেন্স; সম্মিলিত দায়িত্ব:

একটি মেগা সিটির নিরাপত্তা শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি সমন্বিত শাসনব্যবস্থার বিষয়। ইউএন-হ্যাবিট্যাট-এর "নিরাপদ নগরী পদ্ধতি" (Safer Cities Approach) আমাদের শেখায় যে, অপরাধ প্রতিরোধে নগর নেতৃত্ব ও কমিউনিটি পর্যায়ের সমন্বয় অত্যাবশ্যক। সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবহন কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, গণমাধ্যম ও স্থানীয় কমিউনিটিকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে কাজ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একটি বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের সময় পুলিশের ভূমিকা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়, বরং ফায়ার সার্ভিসের জন্য রাস্তা পরিষ্কার রাখা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাথে সমন্বয় করে উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে মিলে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এই সমন্বিত উদ্যোগই একটি স্থিতিশীল নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এ ব্যাপারে একটা সমন্বিত কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

জবাবদিহিতা ও তদারকি; আস্থার ভিত্তি:

জনগণের সেবক হিসেবে পুলিশকে জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হবে। এর জন্য দরকার সহজ ও স্বাচ্ছ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা। একটি শক্তিশালী কমপ্লেইন্ট সেল, স্বাধীন তদারকি সংস্থা, বডি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনার রীতি, নাগরিক ফিডব্যাক জরিপ, অনলাইনে অভিযোগের অগ্রগতি ট্র্যাকিং এবং কোনো সদস্যের অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ-এই উপাদানগুলোই পুলিশি জবাবদিহি নিশ্চিত করে। ইউএনওডিসি-র পুলিশ অ্যাকাউন্টেবিলিটি হ্যান্ডবুক যথার্থই বলেছে, জবাবদিহিতা ও সততা পুলিশের বৈধতা ও হারানো জনআস্থা পুনর্গঠনের জন্য অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশি মেগা সিটির জন্য প্রয়োগযোগ্য একটি মডেল:

উপরোক্ত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার নির্যাস নিয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রাম বা অন্য কোনো মেগা সিটির জন্য একটি বাস্তবধর্মী মডেল তৈরি করা যেতে পারে। এর কাঠামো হতে পারে এরকম: থানা + বিট পুলিশ + কমিউনিটি সেফটি কমিটি + ডিজিটাল কমপ্লেইন্ট সিস্টেম নারী ও শিশু সহায়তা ডেস্ক + সিসিটিভি/ক্রাইম ম্যাপিং + নিয়মিত নাগরিক ফিডব্যাক। প্রথমে, প্রতিটি থানাকে কয়েকটি বিটে ভাগ করে সেখানে স্থায়ী বিট অফিসার নিয়োগ দিতে হবে, যিনি হবেন স্থানীয় কমিউনিটি সেফটি কমিটির সম্পাদক। এই কমিটিতে থাকবেন স্থানীয় কাউন্সিলর, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ইমাম ও নারী নেত্রীরা। তারা প্রতি মাসে এলাকার নিরাপত্তা সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য পিওপি-ভিত্তিককর্মপরিকল্পনা নেবেন। পুলিশের সাড়া প্রদানের ক্ষমতা বাড়াতে হবে একটি সহজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সিসিটিভি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, আর জবাবদিহির জন্য প্রতি তিন মাসে ওই কমিউনিটির কাছ থেকেই ফিডব্যাক নিয়ে তা থানার ডিজিটাল নোটিশ বোর্ডে প্রকাশ করতে হবে।

স্মার্ট মেগা সিটি নিরাপত্তা মডেল; থানার অবকাঠামোগত রূপান্তর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা:

এই মডেলটি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি থানাকে একটি 'স্মার্ট পুলিশিং হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অবকাঠামোগতভাবে, থানার ভেতরে একটি নিবেদিত 'কমিউনিটি ইন্টিগ্রেশন সেল' ও ডিজিটাল কন্ট্রোল রুম থাকা আবশ্যক। জনবল হিসেবে প্রতিটি বিটের জন্য অন্তত একজন স্থায়ী বিট অফিসারসহ পর্যাপ্ত কনস্টেবল নিয়োগ দিতে হবে, যাদের কমিউনিটি পুলিশিং ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। লজিস্টিকস সাপোর্টের মধ্যে প্রতিটি বিট অফিসারের জন্য ট্যাব বা স্মার্ট ডিভাইস, বডি ওর্ন ক্যামেরা এবং দ্রুত যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল থাকা জরুরি। এছাড়া কেন্দ্রীয় ক্রাইম ম্যাপিং সফটওয়্যারের সাথে সংযুক্ত সিসিটিভি নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল ডাটাবেস প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে থানার অবকাঠামো পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করতে হবে।

মানবিক, দৃশ্যমান ও অংশগ্রহণভিত্তিক পুলিশিংয়ের পথে:

মেগা সিটির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অস্ত্র বা সংখ্যার দিক থেকে বাহিনী শক্তিশালী করাই একমাত্র পথ নয়। বরং, পথ হলো পুলিশের দর্শন ও কর্মপদ্ধতির গুণগত পরিবর্তন। পুলিশকে প্রতিক্রিয়াশীল থানাকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে সক্রিয়ভাবে জনগণের মাঝে অবস্থান নিতে হবে। তাদের হতে হবে প্রযুক্তিতে স্মার্ট, আচরণে মানবিক, জবাবদিহিতায় স্বচ্ছ এবং অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি আস্থার প্রতীক। যে মুহূর্তে একজন বস্তিবাসী নারী পুলিশের সহায়তা ডেস্কে নির্ভয়ে তার সমস্যার কথা বলতে পারবেন, একজন কিশোর বিট অফিসারকে নিজের ভাই বা নির্ভরযোগ্য বন্ধু ভেবে বিপদের খবর দেবে, তখনই আমরা বুঝব যে, আমরা একটি জনবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক নগর পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি। আর এটিই হবে ভবিষ্যতের মেগা সিটির জন্য সবচেয়ে টেকসই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

(লেখক-জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ অব:)

Advertisement

Link copied!