দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত ব্যয় কাঠামো তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এবারের বাজেটে একদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য করের হার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের জন্য রাখা হয়েছে একাধিক স্বস্তির ব্যবস্থা। সরকারের দাবি, কর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সঙ্গত ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বছরে ৩ কোটি টাকার বেশি আয় করা ব্যক্তিদের জন্য সর্বোচ্চ আয়করের হার বর্তমান ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হবে। তবে নতুন এই করহার কার্যকর হবে ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে। অর্থাৎ ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশই বহাল থাকবে, কিন্তু এর বেশি আয়ের ওপর অতিরিক্ত অংশে ৩৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্যক্তি করদাতাদের জন্য প্রথমবারের মতো পাঁচ বছরের একটি কর কাঠামো ঘোষণা করা হচ্ছে। এর ফলে করদাতারা আগাম জানতে পারবেন ভবিষ্যতে কোন আয়ের ওপর কত হারে কর দিতে হবে। সরকারের মতে, এতে কর ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হবে।
নতুন কর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হবে। এরপরের ধাপগুলোতে ক্রমান্বয়ে ১০, ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে। সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ করহার শুধুমাত্র ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
মধ্যম ও নিম্ন আয়ের করদাতাদের জন্যও রয়েছে ইতিবাচক বার্তা। আগামী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরে ২০৩০-৩১ করবর্ষে এই সীমা আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে।
বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের জন্যও করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে। নারী করদাতা, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী সিনিয়র সিটিজেন, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী করদাতা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং জুলাই যোদ্ধারা এ সুবিধার আওতায় থাকবেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকদের জন্য বিদ্যমান অতিরিক্ত করমুক্ত আয়ের সুবিধাও বহাল রাখা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুসারে, ২০৩০-৩১ করবর্ষে প্রথম ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। এরপর বিভিন্ন স্তরে ১০, ১৫, ২০, ২৫ ও ৩০ শতাংশ করহার বহাল থাকবে। তবে ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ করহার তখনও কার্যকর থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর তুলনামূলক বেশি কর আরোপের পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, প্রগতিশীল করব্যবস্থা আয়বৈষম্য কমাতে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কর বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, নিয়মিত কর প্রদানকারী ও কর-অনুগত ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ বাড়ালে বিনিয়োগের আগ্রহ এবং কর প্রদানের উৎসাহ কিছুটা কমে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন বাজেটে একদিকে ধনীদের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার। ফলে আয়বৈষম্য কমানো ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই এবারের করনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে সামনে এসেছে।
আপনার মতামত লিখুন :