সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। একই সঙ্গে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের চতুর্থ দিনে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য তুলে ধরেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। লিখিত উত্তরে তিনি জানান, নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন খাতে আরও বিস্তৃত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’—এই নীতিকে সামনে রেখে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে মাসিক আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি ইউনিটে ৬০ হাজার ৪৪টি পরিবার এ সুবিধা পাচ্ছে।
কৃষকদের জন্যও নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। কৃষকের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ২০ হাজার ৭৪৮ জন কৃষক এ কার্ড পেয়েছেন। পাশাপাশি শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এ খাতে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ কৃষক উপকৃত হবেন।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য মাসিক সম্মানী ভাতা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় এ সেবা চালু হবে। ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেফারেল ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের শূন্য পদে ২ হাজার ৮৭৯ জনের নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিক্ষাখাতে আগামী অর্থবছরে দুই লাখ শিশুকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি দেশের ২ হাজার ৩৩৬টি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও ৮ হাজার ২৩২টি মাদ্রাসায় বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাঙ্গুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসার জামানতবিহীন ঋণের সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাপানগামী শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে হাই-টেক ও সফটওয়্যার পার্কগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে পেপ্যাল সেবা চালুর লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অবকাঠামো ও পরিবেশ উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নে ৮ বিঘা এবং প্রতিটি উপজেলায় ১০ বিঘা আয়তনের উন্মুক্ত খেলার মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলমান খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় ৯৬৫ দশমিক ০৪ কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩ কোটি ১৪ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্রীড়া খাতেও নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের নিয়ে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে ক্রীড়া ভাতার আওতায় আনার পরিকল্পনা থাকলেও ইতোমধ্যে ৩০০ জনকে ভাতা প্রদান এবং ৩২৫ জনকে ক্রীড়া কার্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি এসব কর্মপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা।
আপনার মতামত লিখুন :