একদিকে ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা, অন্যদিকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সামাজিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তা উদ্বেগ—এমন এক টানটান পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) পর্দা উঠছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে যৌথ আয়োজক হিসেবে মেক্সিকো উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে মেক্সিকো সিটিতে।
তবে মাঠে খেলা শুরুর আগেই দেশটির সরকারকে সামাল দিতে হচ্ছে একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকট। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক কেন্দ্র ‘জোকালো’ চত্বরে কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরাসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীদের নিয়ে একটি জাঁকজমকপূর্ণ ফ্যান ফেস্টিভ্যাল আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বেতন-ভাতা বৃদ্ধি ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক ইউনিয়নের সদস্যরা গত এক সপ্তাহ ধরে সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করায় অনুষ্ঠানটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিক্ষোভকারীরা বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থাপনা ও ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধের কারণে নগরজীবনও ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউম জানিয়েছেন, প্রয়োজনে জোকালো চত্বরের পরিবর্তে বিকল্প ১৮টি স্থানে ফ্যান ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা হতে পারে।
বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাজধানীকে বর্ণিল সাজে সাজানো হলেও ক্ষোভে ফুঁসছে সমাজের একটি বড় অংশ। প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার নিখোঁজ মানুষের স্বজনরা শহরের বিভিন্ন দেয়ালে পোস্টার টাঙিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, বিশ্বকাপের প্রস্তুতির আড়ালে দীর্ঘদিনের মানবিক সংকটগুলো উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক লুইস আন্তোনিও রোসালেস নারভায়েজ বলেন, “আমরা ফুটবলের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, শহরের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে বিপুল অর্থ ব্যয় নয়।” অনেক নাগরিকের অভিযোগ, শিক্ষা ও জননিরাপত্তার মতো মৌলিক খাতের চেয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সামাজিক অস্থিরতার পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আয়োজক শহর গুয়াদালাহারায় গত ফেব্রুয়ারিতে এক শীর্ষ মাদকচক্র নেতার মৃত্যুর পর সহিংসতা বেড়ে যায়। ফলে বিশ্বকাপকে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করতে সেখানে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে।
আগামী ২৬ জুন গুয়াদালাহারায় স্পেন ও উরুগুয়ের ম্যাচ দেখতে স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপের সফরও নির্ধারিত রয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা ও মনতেরিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এক লাখের বেশি সেনা, নৌসেনা, ন্যাশনাল গার্ড ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর এবং দলগুলোর আবাসন কেন্দ্রগুলোতে ফিফার সঙ্গে সমন্বয় করে অ্যান্টি-ড্রোন ইউনিট, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এবং বিশেষ ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট টিম কাজ করছে।
ফুটবলের মহোৎসব শুরু হলেও এর আড়ালে মেক্সিকোকে একইসঙ্গে সামাজিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের পাশাপাশি এসব সংকট কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারে দেশটি, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।
আপনার মতামত লিখুন :