রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় তার ছেলের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন দুজন চিকিৎসক। এ ঘটনার প্রতিবাদে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। একইসঙ্গে জরুরি বিভাগ বন্ধ করে রাখা হয় দুই ঘন্টা।
শনিবার (১৩ জুন) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ ছিল। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনেরা দুর্ভোগে পড়েন। রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল
সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোরে নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার নূর নাহার বেগমকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মৃতের ছোট ছেলে রিফাত হোসেন। একপর্যায়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এসময় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী ইনডোর অফিসার ডা. রাকিব হাসান মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। তারা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এতে শনিবার সকাল ১১টা থেকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর দুপুর ১টার দিকে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়।
অন্যদিকে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, নূর নাহার বেগমের মৃত্যুর পর তার মরদেহ হাসপাতালের আইসিইউতে আটকে রাখা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের কাউকে দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে শনিবার দুপুরে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলাকালে হাসপাতালের কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী বাধা দেন। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স থেকে মরদেহ নামিয়ে হাসপাতালের মর্গে নিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা।
শনিবার দুপুর ১টার দিকে হাসপাতালের মর্গের সামনে গিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। এসময় তারা চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করছিলেন। এসময় চিকিৎসক মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত রিফাত হোসেন হাসপাতালের পরিচালক কার্যালয়ে অবস্থান করছেন এমন খবরে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে অবস্থান নেন। অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করানোর শাস্তির দাবিতে তারা পরিচালক কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দিতে থাকেন।
তবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আসিফ। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। তবে কোনো মরদেহ আটকে রাখা হয়নি। অন্যদিকে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের দাবিতে রোগীর স্বজনেরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
রোগীর ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু বলেন, আমার মা ভোরে মারা গেছেন অথচ এখন পর্যন্ত তার মুখটা দেখতে পারিনি। তারা লাশ অ্যাম্বুলেন্স থেকে কেড়ে নিয়ে মর্গে রেখেছে। আমরা তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বারবার আকুতি জানিয়েছি, তারপরও তারা লাশ দিচ্ছে না।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনা দেখা গেছে। এটি অত্যন্ত অমানবিক ঘটনা। মরদেহ আটকে রাখা এবং জরুরি বিভাগ বন্ধ রাখার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। তবে অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় সেখানে অতিরিক্ত মানুষের ভিড় ছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে মরদেহটি মরচুয়ারিতে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা অভিযোগ দাখিল করব, এজাহার দেব। অভিযুক্তকে পুলিশে দিয়েছি। তবে এসময় পরিচালকের কার্যালযয়ে উপস্থিত মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (অপরাধ) মো. মাহফুজুর রহমান ও কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম নাজমুল কাদেরের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কথা বলতে রাজি হননি।
আপনার মতামত লিখুন :