টানা বৃষ্টিতে বন্যা, পাহাড়ধস, শিশুর মৃত্যু; পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত

মোঃ হাসান , বান্দরবান, জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৮ জুলাই, ২০২৬, ০৪:০৮ পিএম

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দুর্যোগ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে পার্বত্য জেলা বান্দরবান। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা, পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কয়েকটি উপজেলায় সড়ক ও নৌযোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম–বান্দরবান সড়কের সাতকানিয়া উপজেলার দস্তিদারহাট এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যেকোনো সময় বান্দরবানের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝর্ণা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ ও দুর্গম এলাকায় ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বান্দরবান জেলার সব পরীক্ষা কেন্দ্রে ৮ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র (বিষয় কোড-১০৮) স্থগিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ফেসবুক পেজে জানানো হয়েছে, স্থগিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরে ঘোষণা করা হবে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অব্যাহত বর্ষণে থানচি উপজেলায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে উপজেলা সদর থেকে তিন্দু ও রেমাক্রী ইউনিয়নের নৌযোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। সেখানে পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে ভেসে আলিয়া সোলতানা (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে লামা ও আলীকদম উপজেলায় মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আলীকদমের প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

ভারী বর্ষণের কারণে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের কাইচতলী এলাকায় মৃত মুক্তার হোসেনের বাড়ি পাহাড়ধসে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আরও কয়েকটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা সদরের কালাঘাটা, বালাঘাটা, বনরূপাপাড়া, সিদ্দিকনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকার বহু পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।

এদিকে জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। জেলা প্রশাসনের ফেসবুক পেজে তাঁর পরিদর্শনের সরাসরি সম্প্রচারও করা হয়, যেখানে অনেকেই দুর্যোগকালে প্রশাসনের তৎপরতার প্রশংসা করেছেন।

জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে সড়কের ওপর মাটি ও পাথর পড়ে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় সড়ক সচল রাখতে কাজ চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”

Advertisement

Link copied!