কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাতজন শিক্ষককে একযোগে বদলির আদেশের প্রতিবাদে কলেজটির শিক্ষার্থীরা আবেগঘন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। শনিবার ২৫ জুলাই সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কলেজ প্রাঙ্গণে শান্তিপূর্ণ এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের একপর্যায়ে বদলিকৃত শিক্ষকদের একজন, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীন উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালে সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
শিক্ষার্থীরা জানান, সম্প্রতি অতিবৃষ্টির কারণে কলেজ কেন্দ্রে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাতজন শিক্ষককে একযোগে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনার জন্য শিক্ষকদের দায়ী করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তাদের দাবি, জলাবদ্ধতার বিষয়টি দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং এটি শুধু সরকারি মহিলা কলেজেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই সময়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড, কুমিল্লা সদর হাসপাতালসহ পুরো শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, কলেজের জলাবদ্ধতার বিষয়টি তারা অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছিলেন। গত পহেলা বৈশাখে কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্যের কাছে এ বিষয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ জানানো হয়। পরে এমপির কন্যা চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস কলেজ পরিদর্শনে এলে তাকেও সমস্যার কথা অবহিত করা হয়। এরপরও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই অবকাঠামোগত সমস্যার দায় শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনের একপর্যায়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মহসীন কলেজে এসে শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে করজোড়ে আন্দোলন বন্ধ করার অনুরোধ জানান। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “আমি সরকারি চাকরি করি। আমার বদলি হয়েছে। তোমরা আন্দোলন করে আমার চাকরিটা খাইও না। আমি পরিবার নিয়ে না খেয়ে পড়ে থাকতে চাই। তোমরা আমার সঙ্গে আসো, আমার চাকরিটা থাকবে না।”
তার এ বক্তব্যে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি আমাদের বাবার মতো। আপনার কোনো ক্ষতি হোক আমরা চাই না। তবে অন্যায়ের প্রতিবাদও আমরা বন্ধ করব না।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাধ্যক্ষসহ সাতজন অভিজ্ঞ শিক্ষককে একসঙ্গে বদলি করায় কলেজের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কলেজে দায়িত্ব পালন করা এসব শিক্ষকের বদলিতে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তারা বদলির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কলেজে বহাল রাখার দাবি জানান।
বদলিকৃত শিক্ষক মোহাম্মদ মহসীন সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং তিনি সেটিকে মেনে নিয়েছেন। তবে তার একটি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে। সেই বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে সরকার যদি বদলির আদেশ পুনর্বিবেচনা করে, তাহলে তিনি কৃতজ্ঞ থাকবেন। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আন্দোলন থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, গত ১৩ জুলাই অতিবৃষ্টির কারণে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে এবং বৃষ্টিতে ভিজে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হয়। অনেকে ভেজা পোশাকেই পরীক্ষায় অংশ নেন। এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনও হয়। ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর কলেজের সাতজন শিক্ষককে স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন।
শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শিক্ষকদের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। তাদের দাবি, অবকাঠামোগত সমস্যার দায় শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

আপনার মতামত লিখুন :