মোহাম্মদ আইয়ুব, মাতামুহুরী: কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দই এখন আর শুধু স্থানীয়দের রসনা তৃপ্তির খাবার নয়; এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। খাঁটি গরুর দুধ, শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুত প্রণালী এবং অনন্য স্বাদের কারণে মাতামুহুরীর দই ধীরে ধীরে নিজস্ব একটি ব্র্যান্ড পরিচিতি গড়ে তুলছে। প্রতিদিনই চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা দই কিনতে আসছেন। অনেকে আবার আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনের জন্য উপহার হিসেবেও নিয়ে যাচ্ছেন এই ঐতিহ্যবাহী দই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিয়ে, ওয়ালিমা, আকিকা, মিলাদ মাহফিল, ঈদ, পূজা, জন্মদিনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাতামুহুরীর দই এখন বিশেষ আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। উৎসবের মৌসুমে চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় দই প্রস্তুতকারীদের দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করতে হয়।
মাতামুহুরি উপজেলার ইলিশিয়া বাজারের দই ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, “মাতামুহুরীর দইয়ের স্বাদ ও গুণগত মানের কারণেই প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসছেন। বিশেষ অনুষ্ঠানগুলোর সময় চাহিদা এত বেশি থাকে যে আগাম অর্ডার নিতে হয়। আমরা সবসময় খাঁটি দুধ ব্যবহার করে দই তৈরি করি, যাতে ক্রেতাদের আস্থা অটুট থাকে।”
লাল ব্রিজ এলাকার দই ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বাবর বলেন, “দুধ, চিনি ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। তবুও আমরা মানের সঙ্গে কোনো আপস করি না। সঠিক প্রচার ও সরকারি সহযোগিতা পেলে মাতামুহুরীর দই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।”
একই এলাকার আরেক উদ্যোক্তা মোহাম্মদ ইমন বলেন, “এখন শুধু স্থানীয় নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ দই কিনতে আসেন। আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।”
দই প্রস্তুতকারীরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে খাঁটি গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে দই তৈরি করা হয়। পরিমিত পরিমাণ চিনি ব্যবহার এবং মাটির পাত্রে সংরক্ষণের কারণে এর স্বাদ, ঘনত্ব ও সুগন্ধ অন্য এলাকার দই থেকে আলাদা। এই স্বাতন্ত্র্যই ক্রেতাদের বারবার মাতামুহুরীর দইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, কয়েক বছর আগেও দইয়ের বাজার উপজেলাকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু বর্তমানে চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। নতুন নতুন ক্রেতা যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনও বেড়েছে। তবে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে এসেছে। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি দই ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাতামুহুরীর দইকে ঘিরে পরিকল্পিত ব্র্যান্ডিং, আধুনিক প্যাকেজিং, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। পাশাপাশি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশ-বিদেশে মাতামুহুরীর দইয়ের নতুন বাজার তৈরি হবে। এতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আয় বাড়বে, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং সমৃদ্ধ হবে এলাকার অর্থনীতি।
ঐতিহ্য, স্বাদ ও গুণগত মানের অনন্য সমন্বয়ে মাতামুহুরীর দই এখন শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, বরং কক্সবাজারের একটি সম্ভাবনাময় ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।

আপনার মতামত লিখুন :