সিলেটের মহাসড়কে ৬ মাসে ১১৭ মৃত্যু: ১৮৫ দুর্ঘটনায় আহত ২৭৫, কমছে না সড়কের ঝুঁকি

মোঃ আব্দুস সামাদ আজাদ , মৌলভীবাজার জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট, ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম

সিলেটের মহাসড়কে ৬ মাসে ১১৭ মৃত্যু: ১৮৫ দুর্ঘটনায় আহত ২৭৫, কমছে না সড়কের ঝুঁকি

সিলেট বিভাগের মহাসড়কগুলো যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই ,মাত্র ছয় মাসে বিভাগের বিভিন্ন মহাসড়কে ১৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১১৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৭৫ জন। তাদের মধ্যে ১০৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনাগুলোর ঘটনায় দায়ের হয়েছে ৯৫টি মামলা।হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিয়নের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের মধ্যে মার্চে প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি, আর মে মাসে দুর্ঘটনার সংখ্যা সর্বোচ্চ। অর্থাৎ সড়কে দুর্ঘটনা কমানোর নানা উদ্যোগ ও আইন প্রয়োগের পরও মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন, মার্চে ৩৬টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন, এপ্রিলে ২৩টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন, মে মাসে সর্বোচ্চ ৪০টি দুর্ঘটনায় ২২ জন, জুনে ৩২টি দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ ২৯ জন এবং জুলাইয়ে ৩২টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন।ছয় মাসে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন ১০৯ জন এবং সাধারণ আহত হয়েছেন ১৬৬ জন।পরিসংখ্যান বলছে, মার্চে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩৬টি হলেও নিহতের সংখ্যা ২৪ জন। অন্যদিকে জুনে দুর্ঘটনা ৩২টি হলেও প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ জনে। এতে শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, দুর্ঘটনার ধরন ও ভয়াবহতাও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের মতে, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ, নির্মাণকাজের ধীরগতি, সড়কে বালু-কাদা ও নির্মাণসামগ্রীর ঝুঁকি, অতিরিক্ত গতি এবং বেপরোয়া ওভারটেকিং দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে চালকদের অসতর্কতা, দীর্ঘসময় গাড়ি চালানোর ফলে ক্লান্তি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং মহাসড়কে ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা। বিশেষ করে ঈদ, সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন উৎসবকেন্দ্রিক সময়ে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু দুর্ঘটনার পর মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নিলেই সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সড়কের ত্রুটি দ্রুত সংস্কার, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি।হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিয়নের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত অভিযান, নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জোরদার করেছে।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিশেষ তদারকি, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষায়, টেকসই পরিবর্তনের জন্য শুধু পুলিশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; চালক, যাত্রী, পরিবহন মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। পুলিশ সুপার জানান, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান হাইওয়ে পুলিশ সিলেট রিজিয়নের সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

ছয় মাসে ১৮৫টি দুর্ঘটনা, ১১৭ জনের মৃত্যু এবং ২৭৫ জন আহত হওয়ার পরও প্রশ্ন উঠছে ,কেবল অভিযান ও আইন প্রয়োগ দিয়ে কি সিলেট বিভাগের মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করা সম্ভব? সড়কের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, যানবাহনের ফিটনেস, চালকদের দক্ষতা ও মানসিকতা এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা এসব বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলা না করলে দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান কমানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাই সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিটি ঘটনার কারণ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিতকরণ, সড়ক সংস্কার, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের দাবি উঠেছে। অন্যথায় মহাসড়কে প্রাণহানির এই ধারাবাহিকতা থামানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

প্রশ্ন এখন একটাই, আর কত প্রাণ গেলে নড়বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? আর কত পরিবারে শোক নেমে এলে মহাসড়ক সত্যিকার অর্থে নিরাপদ করার উদ্যোগ দৃশ্যমান হবে? ছয় মাসে ১১৭ প্রাণহানির এই হিসাব যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে হারিয়ে না যায় প্রয়োজন এখন দৃশ্যমান, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ। কারণ নিরাপদ সড়ক কোনো প্রতিশ্রুতি নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার।

সিয়াম সরিষা
Link copied!