পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে নবনির্মিত সেফটিক ট্যাংকের ভেতরের কাঠের সেন্টারিং খুলতে গিয়ে বাবুরাম দেবসিংহ (৩৫) নামে এক নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় বাড়ির মালিকের মামা ও শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রাব্বি হোসেনকে প্রধান আসামি করে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের অমরখানা জাম্বুরাতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত বাবুরাম দেবসিংহ চিলাহাটি ইউনিয়নের বলরামপুর এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় গৌতম চন্দ্র রায় নামে আরও এক শ্রমিক দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অপর শ্রমিক ভাগ্য রায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর সুস্থ বোধ করায় বাড়ি ফিরে গেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও বাড়ির মালিক নবির হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন হেড মিস্ত্রি উত্তম রায়ের সঙ্গে বাবুরাম, গৌতম চন্দ্র রায় ও ভাগ্য রায় নবির হোসেনের বাড়িতে জানালার কাজ করছিলেন। জানালার কাজ শেষে হেড মিস্ত্রির নির্দেশে তাঁরা নবনির্মিত সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে গিয়ে কাঠের সেন্টারিং খুলতে প্রবেশ করেন। প্রথমে বাবুরাম ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি অসুস্থ বোধ করার কথা জানান। এরপর গৌতম চন্দ্র রায় ও ভাগ্য রায় পর্যায়ক্রমে ট্যাংকের ভেতরে ঢুকলে তাঁরাও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এ সময় বাড়িতে থাকা নবির হোসেনের মা লাভলী বেগম ট্যাংকের ভেতর থেকে শ্রমিকদের ডাকাডাকি শুনতে পান। পরে তাঁর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তিন শ্রমিককে ট্যাংকের ভেতর থেকে উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে বাবুরামের মৃত্যু হয়। পরে গৌতমকে দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। ভাগ্য রায় সুস্থ বোধ করায় বাড়িতে চলে যান।
এ ঘটনায় নিহতের চাচা বুদ্ধ চরণ দেবসিংহ বাদী হয়ে দেবীগঞ্জ থানায় আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় শালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও বাড়ির মালিক নবির হোসেনের মামা রাব্বি হোসেনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, রাব্বি হোসেনের বাড়ির নবনির্মিত সেফটিক ট্যাংকের সংস্কারকাজের জন্য বাবুরামকে ডেকে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ঢাকনা দিয়ে বন্ধ থাকায় ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হলেও কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা না নিয়েই তাঁকে সেখানে নামানো হয়। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেও যথাসময়ে উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না করায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাড়ির মালিক নবির হোসেন। তিনি বলেন, তিনি ঢাকায় থাকেন এবং ঘটনার দিন মিস্ত্রি ও শ্রমিকরা তাঁর বাড়িতে মূলত জানালার কাজ করতে এসেছিলেন। সেফটিক ট্যাংকটিও প্রায় দেড় মাস আগে ওই মিস্ত্রিরাই নির্মাণ করেছিলেন। জানালার কাজ শেষে হেড মিস্ত্রি উত্তম রায় শ্রমিকদের ট্যাংকের ভেতরে গিয়ে কাঠের সেন্টারিং খুলতে বলেন। নবির হোসেন আরও বলেন, তাঁর মা তখন বাড়িতে একা ছিলেন। শ্রমিকদের ডাকাডাকি শুনে তিনি এগিয়ে গিয়ে তাঁদের অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পান। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউ শ্রমিকদের ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করতে বাধ্য করেননি। হেড মিস্ত্রির নির্দেশেই তাঁরা সেখানে প্রবেশ করেন। নবনির্মিত হওয়ায় ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস থাকার বিষয়টিও তাঁদের জানা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার প্রধান আসামি রাব্বি হোসেন ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলেও দাবি করেন নবির হোসেন। তাঁর ভাষ্য, ঘটনাস্থলে না থাকা সত্ত্বেও তাঁর মামা, মা ও নানাসহ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
রাব্বি হোসেন বলেন, ঘটনার সময় তিনি চিলাহাটি ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকায় ছিলেন। পরে তাঁর স্ত্রীর ফোন পেয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখেন, শ্রমিকদের সেফটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, বাড়িটি তাঁর ভাগিনার এবং ওই মিস্ত্রিরাই বাড়ির সব কাজ করেছেন। হেড মিস্ত্রির নির্দেশে শ্রমিকরা ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে সেন্টারিং খুলতে গিয়ে অসুস্থ হন। এতে তাঁর বা তাঁর পরিবারের কারও কোনো দোষ নেই।
শ্রমিক ভাগ্য রায় বলেন, তাঁরা সকাল ৯টা থেকে কাজ করছিলেন। বিকেলে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য তিনি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সন্ধ্যার দিকে হেড মিস্ত্রি বাবুরাম ও গৌতমকে সেফটিক ট্যাংকের সেন্টারিং খুলতে বলেন। প্রথমে বাবুরাম ও পরে গৌতম ট্যাংকের ভেতরে ঢোকেন। পরে তাঁদের উদ্ধারের জন্য তিনি নিজেও ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে নিঃশ্বাস নিতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি নিজেকে অটোরিকশায় হাসপাতালে নেওয়া অবস্থায় দেখতে পান। ভাগ্য রায় আরও বলেন, এর আগে তিনি, বাবুরাম বা অন্য শ্রমিকরা কখনো সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিংয়ের কাজ করেননি।
অন্যদিকে মামলার বাদী বুদ্ধ চরণ দেবসিংহের দাবি, বাবুরামকে যথাসময়ে ট্যাংক থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে তাঁর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। আসামিদের অবহেলার কারণেই তাঁর ভাতিজার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুসা মিয়া বলেন, সেফটিক ট্যাংকের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :