দশমিনায় গরিবের ডাক্তার আলী আকবর সাহেবে আমাদের মাঝে আর নেই

মোঃ নুর নবী , দশমিনা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

দশমিনায় গরিবের ডাক্তার আলী আকবর সাহেবে আমাদের মাঝে আর নেই

ফাইল ফটো

কিছু মানুষের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; একটি জনপদের জন্যও হয়ে ওঠে অপূরণীয় ক্ষতি। ডা. আলী আকবর সাহেবের প্রয়াণ তেমনই এক বেদনার অধ্যায়। পটুয়াখালীর দশমিনায় সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন শুধু একজন চিকিৎসক নন, ছিলেন আস্থা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানুষের কাছে ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

১৯৮২ সালে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর তাঁর সামনে ছিল সরকারি চাকরিসহ প্রতিষ্ঠিত জীবনের নানা সুযোগ। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন এক পথ,  নিজ এলাকার মানুষের পাশে থাকার পথ। দশমিনা থানা সড়কের সামনে চেম্বার খুলে মাত্র ২০ টাকার বিনিময়ে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে না পারা মানুষ তাঁর কাছে পেয়েছেন সহানুভূতি; অনেকেই পেয়েছেন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা।

এখানেই ডা. আলী আকবর সাহেবের বিশেষত্ব। তিনি চিকিৎসাকে কখনো শুধুই পেশা হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে চিকিৎসা ছিল মানুষের প্রতি দায়িত্ব। চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য তাঁর দরজা ছিল উন্মুক্ত। চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রনের আড়ালে যে মানবিক হৃদয় থাকতে পারে, তিনি ছিলেন তার এক অনন্য উদাহরণ।

তাঁর অবদান চিকিৎসাক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ডলি আকবর মহিলা কলেজ, দশমিনা প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, মধ্য আলীপুরা ডাক্তারের হাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ডাক্তারের হাট কওমি মাদ্রাসা ও মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। এসব প্রতিষ্ঠান তাঁর চিন্তা, দায়িত্ববোধ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার সাক্ষ্য বহন করবে।

একটি জনপদের উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণে হয় না; উন্নয়ন ঘটে মানুষের চিন্তা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে। ডা. আলী আকবর সাহেব সেই বৃহত্তর উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন, একজন অসহায় মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া যেমন মানবসেবা, তেমনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করার বিনিয়োগ।

তাঁর সহধর্মিণী ডা. শামচুন্নাহার খান ডলি দীর্ঘদিন দশমিনা উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের পরিবার শিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠিত। তবে ডা. আলী আকবর সাহেবের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল পদ-পদবি বা পারিবারিক পরিচয় নয় সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তাঁর গভীর অবস্থান। আজ রোববার সকালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে দশমিনা মডেল মসজিদ ও মধ্য আলীপুরা ডাক্তারের হাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি ছিল তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক নীরব বহিঃপ্রকাশ।

আজ দশমিনা এমন একজন মানুষকে হারিয়েছে, যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। তাঁর শূন্যতা পূরণ করা সহজ হবে না। তবে তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, অসংখ্য মানুষের দোয়া এবং মানবসেবার আদর্শ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে। সমাজে এমন মানুষের প্রয়োজন সবসময়। ডা. আলী আকবর সাহেবের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি কতটা সম্পদ অর্জন করেছেন, তা নয়; বরং তাঁর কারণে কত মানুষের জীবন একটু সহজ, একটু সুন্দর হয়েছে।

দশমিনার এই আলোকিত মানুষটির প্রয়াণে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি। মহান আল্লাহ তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানবসেবার আদর্শ থেকে যায়। ডা. আলী আকবর সাহেবও তাঁর কর্ম ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে দশমিনার মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন।

সিয়াম সরিষা
Link copied!