ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাধ্যতামূলক অবসরের শিকার হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চাকরিতে পুনর্বহাল ও পদোন্নতি পাওয়া বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ডিআইজি ড. মো. নাজমুল করিম খানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর পুলিশ সদর দপ্তরের এক আদেশে তাকে সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে বলা হলেও দীর্ঘ সময়েও এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে একজন দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
বাধ্যতামূলক অবসর ও পুনর্বহালের পটভূমি
অনুসন্ধানে জানা যায়, ড. মো. নাজমুল করিম খান সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে বিশেষ পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। পরবর্তীতে আইনি লড়াই এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তের পর ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তিনি সসম্মানে চাকরিতে পুনর্বহাল হন।
পুনর্বহালের পর ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়ে তিনি প্রথমে পুলিশ স্টাফ কলেজে এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর জিএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবেও নির্বাচিত হন। তারপর ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও, কেন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হ'ল এব্যাপারে তাকে অদ্যবধি অববহিত করা বা করণ দর্শন নোটিশ করা হয়নি, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল।
গাজীপুরে কর্মতৎপরতা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ
জিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর ড. নাজমুল করিম খান গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মব কালচার রোধ, ছিনতাই ও মাদকবিরোধী অভিযান, অবৈধ জুয়া ও হোটেলভিত্তিক অপরাধ দমন এবং পোশাকশিল্পের চলমান অস্থিরতা মোকাবিলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া বিশ্ব ইজতেমার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
তার নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি বড় অপরাধ চক্র ও বিপুলসংখ্যক ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হয়। বিশেষ করে, আলোচিত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যা মামলার তদন্তে তিনি দ্রুততম সময়ে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় নিয়ে আসেন। তার এই তৎপরতা সাংবাদিক সমাজসহ সাধারণ মানুষের মাঝে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
দায়িত্ব পালন ও বদলি সংক্রান্ত বিতর্ক
দায়িত্ব পালনকালে জিএমপির কমিশনারদের জন্য নিজস্ব সরকারি আবাসন সুবিধা না থাকায় পূর্বেও অনেক কর্মকর্তা ঢাকায় অবস্থান করে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ববর্তী কমিশনারদের ক্ষেত্রে এই চর্চা নিয়মিত থাকলেও ড. নাজমুল করিম খানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে সামনে আনা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তার কঠোর অবস্থানের কারণে অপরাধী চক্র ও প্রভাবশালী একটি মহল তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে থাকতে পারে। কোনো সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই তাকে আকস্মিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে কোনো মহলের নেপথ্য তৎপরতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেশাদার মহলে অসন্তোষ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের দাবি
ফ্যাসিবাদী আমলে রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার একজন কর্মকর্তাকে এখনো পুনর্বহাল না করে এভাবে কার্যভারহীন রাখার ঘটনায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে একজন কর্মকর্তার পেশাগত দক্ষতা, সততা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তার অবদানকে মূল্যায়ন করা উচিত।
অভিজ্ঞ মহল মনে করছে, ড. মো. নাজমুল করিম খানের মতো একজন উচ্চশিক্ষিত (জাপান থেকে কৃষি বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী) ও দক্ষ কর্মকর্তার বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা যাচাই এবং দায়িত্ব পালনে তার ভূমিকার সঠিক মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন :