১৭ বছরের বঞ্চনা, আইজিপির বিরক্তি এবং পুলিশ সংস্কারের অসমাপ্ত দায় :- ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান , লেখক

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৪২ এএম

১৭ বছরের বঞ্চনা, আইজিপির বিরক্তি এবং পুলিশ সংস্কারের অসমাপ্ত দায় :- ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

ফাইল ফটো

তদবির বন্ধ করতে হলে আগে ন্যায়বিচারের দরজা খুলতে হবে প্রকৃত বঞ্চিতদের সুরক্ষা, বিতর্কিত পদায়নের স্বচ্ছ পর্যালোচনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশই এখন রাষ্ট্রের বড় পরীক্ষা: একটি অনলাইন পোর্টালে ১৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘১৭ বছর বঞ্চিত’ তদবিরে বিরক্ত আইজিপি শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকার দাবি তুলে বিভিন্ন দপ্তরে তদবিরে ছুটে বেড়ানো পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেছেন, “তদবির করে ভালো কোথাও পোস্টিং পাওয়া যায় না। মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রমাণ করতে হবে।” একই সভায় তিনি অনৈতিক লেনদেন থেকে বিরত থাকারও নির্দেশ দেন। আইজিপির বক্তব্যের একটি শক্ত নৈতিক ভিত্তি অবশ্যই আছে। পুলিশে পদায়ন বা পদোন্নতি তদবির, অর্থ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। কিন্তু এখানেই আলোচনা শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে সামনে আসে—যারা সত্যিই দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের ন্যায্য প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা রাষ্ট্র কি সময়মতো তৈরি করতে পেরেছে?

আইজিপির বিরক্তি স্বাভাবিক, কিন্তু বঞ্চনার প্রশ্নও বাস্তব: একটি বাহিনীর প্রধান প্রতিদিন ব্যক্তিগত পোস্টিং, বদলি ও পদোন্নতির অনুরোধ সামলাবেন এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে না। এতে শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং যোগ্যতার পরিবর্তে যোগাযোগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব তথ্যে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, পদোন্নতি পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আইজিপির মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থার আহ্বান নীতিগতভাবে যথার্থ। কিন্তু কোনো কর্মকর্তা যদি বছরের পর বছর যোগ্য হয়েও রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক পরিচয়, মতাদর্শ সম্পর্কে সন্দেহ কিংবা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অপছন্দের কারণে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন, তিনি কোথায় যাবেন? কে তাঁর অভিযোগ শুনবে? কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেবে? কীভাবে প্রমাণ করবেন যে তাঁর জুনিয়র পদোন্নতি পেয়েছেন অথচ তিনি রাজনৈতিক বিবেচনায় আটকে ছিলেন?এই প্রশ্নগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর না দিয়ে শুধু “তদবির করবেন না” বললে বক্তব্যটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

বঞ্চনার অভিযোগকে নিছক আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই: শেখ হাসিনা আমলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতের রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে যে অভিযোগ ছিল, সেটি কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের ২০২৫ সালের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, দীর্ঘ একদলীয় শাসনের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা খাত ক্রমে রাজনৈতিকীকৃত হয়েছিল। সেখানে আরও বলা হয়, অনেক পুলিশ কর্মকর্তার নিয়োগ ও পদোন্নতিতে পেশাদারিত্ব, সততা ও মেধার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা সরকারের প্রতি কথিত রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায় আসত। একই প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের পদায়ন দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। অতএব, দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগকে সামগ্রিকভাবে ‘তদবিরকারীদের অজুহাত’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং প্রকৃত বঞ্চনা শনাক্ত করাই ছিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আইজিপির বক্তব্যের মাত্র এক দিন আগে ১২ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন কনস্টেবল থেকে ডিআইজি পর্যন্ত সদস্যদের পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কয়েকজন ব্যক্তির অভিযোগ নয়; বাহিনীর অভ্যন্তরে পদোন্নতি-পদায়নের জটিলতা এখনো বাস্তব প্রশাসনিক বিষয়।

তাহলে পূর্ণাঙ্গ ‘বঞ্চিত তালিকা’ কেন আগে হলো না? সরকার পরিবর্তনের পরপরই পুলিশে একটি স্বাধীন বঞ্চনা পর্যালোচনা বোর্ড গঠন করা যেত। কে প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত, কে পেশাগত দুর্বলতার কারণে পদোন্নতি পাননি, কার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তি ছিল, আর কে সরকার পরিবর্তনের সুযোগে নিজেকে হঠাৎ ‘বঞ্চিত’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন—এসব আলাদা করা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রের অন্য অংশে এমন মডেলের নজিরও আছে। সরকারি চাকরিতে অতীতে পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের আবেদন যাচাইয়ের জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি ২০২৫ সালে দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩১৮টি আবেদন পরীক্ষা করে ৭৮ কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির সুপারিশ করেছিল; আবার যোগ্যতার ঘাটতি বা অসম্পূর্ণ নথির কারণে অনেক আবেদন প্রত্যাখ্যানও করেছিল। 

তাহলে পুলিশে কেন একই ধরনের সুসংগঠিত ব্যবস্থা থাকবে না? এমন ব্যবস্থা থাকলে একজন কর্মকর্তা অনলাইনে আবেদন করতেন, একটি ট্র্যাকিং নম্বর পেতেন, প্রয়োজনীয় নথি দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কারণযুক্ত সিদ্ধান্ত পেতেন। আইজিপির দপ্তরে ব্যক্তিগতভাবে যাওয়ার প্রয়োজনই হতো না। অতএব বর্তমান তদবিরের দায় শুধু তদবিরকারীর নয়; ন্যায়বিচারের বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক পথ যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়াও এই পরিস্থিতির একটি কারণ।

ময়মনসিংহ রেঞ্জের প্রশ্ন: অভিযোগের বিচার হোক নথিতে, গুজবে নয়: পুলিশের পদায়ন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পুলিশ সদর দপ্তরে পদোন্নতি ও পদায়ন ঘিরে কয়েকজন কর্মকর্তা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। ওই প্রতিবেদনে ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার নামও আসে; সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছিল, তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ পদায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় সাত রেঞ্জে পদায়িত ডিআইজিদের মধ্যে পাঁচজন পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছিল, পদোন্নতি ও পদায়ন বিধিবিধান অনুসারেই হয়েছে। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদোন্নতি পাওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নিজে থেকে কাউকে অপরাধী, দলীয় কর্মকর্তা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী প্রমাণ করে না। আবার গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের অজুহাতে সেটি অগ্রাহ্য করাও গ্রহণযোগ্য নয়। ময়মনসিংহ রেঞ্জে বর্তমানে মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান ডিআইজি হিসেবে দায়িত্বে আছেন সরকারি ওয়েবসাইটে ৪ আগস্ট ২০২৬ তাঁর নামই হালনাগাদ রয়েছে। তার আগে দায়িত্বে থাকা মো. আতাউল কিবরিয়াকে ২১ জুলাই ২০২৬ সিআইডিতে বদলি করা হয়েছিল। তবে প্রকাশ্য সরকারি তথ্য বা নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে তাঁর ওই বদলিকে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এই জায়গাতেই রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে। সত্য হলে ব্যবস্থা হবে। মিথ্যা হলে কর্মকর্তাও পরিষ্কারভাবে দায়মুক্ত হবেন। গুজব দিয়ে কাউকে দোষী বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়াও অন্যায়।

ফ্যাসিবাদের উত্তরাধিকার দূর করা মানে প্রতিশোধ নয় প্রতিষ্ঠান শুদ্ধ করা: একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়ংকর উত্তরাধিকার কয়েকজন ব্যক্তি নয়; বরং একটি সংস্কৃতি দল দেখে পদায়ন, ফোনে বদলি, আনুগত্য দেখে পদোন্নতি, বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে দেখা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা। সরকার বদলের পর পুরোনো সুবিধাভোগীদের জায়গায় যদি নতুন সুবিধাভোগীরা বসেন, তাহলে সংস্কার হয় না কেবল ক্ষমতার সুবিধাভোগী বদলায়। তাই ‘ফ্যাসিস্ট আমলের কর্মকর্তা’ লেবেল দিয়েই কাউকে গণহারে বাদ দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রেখে প্রকৃত বঞ্চিতদের আবারও উপেক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দরকার vetting, due process এবং documented decision। কে কী করেছেন, কোন বেআইনি নির্দেশ দিয়েছেন, কার বিরুদ্ধে নির্যাতন-দুর্নীতির অভিযোগ আছে, কে রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্যকে বঞ্চিত করেছেন—এসব নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করতে হবে।

বঞ্চিতদের অধিকার রক্ষায় সাতটি জরুরি পদক্ষেপ: 

১.স্বাধীন বঞ্চনা পর্যালোচনা বোর্ড গঠন করে পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরের নিরপেক্ষ সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

২.২০০৯-২০২৪ সময়কালের পদোন্নতি,পদায়ন,ওএসডি, বাধ্যতামূলক অবসর ও গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ের ডিজিটাল অডিট করতে হবে।

৩.প্রত্যেক আবেদনকারীকে নথিভিত্তিক শুনানির সুযোগ দিয়ে ৬০-৯০ দিনের মধ্যে কারণযুক্ত সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

৪.রাজনৈতিক কারণে বঞ্চনা প্রমাণিত হলে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, আর্থিক সুবিধা ও উপযুক্ত পদায়ন পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

৫.একই সঙ্গে নির্যাতন, দুর্নীতি, বেআইনি বলপ্রয়োগ বা গুরুতর পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে; নতুন রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কেউ যেন দায়মুক্তি না পান।

৬. পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ের প্রকাশ্য ও লিখিত মানদণ্ড থাকতে হবে, যাতে ‘তদবিরের পোস্টিং’ এবং ‘গোপন তালিকা’ দুটোরই অবসান ঘটে।

৭.সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একটি সীমিত প্রশাসনিক আপিল ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে ন্যায়বিচারের জন্য কাউকে আইজিপির ব্যক্তিগত দরজায় যেতে না হয়।

আইজিপির আরও ধৈর্যশীল হওয়া প্রয়োজন: আইজিপি শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি এমন একটি বাহিনীর প্রধান, যে বাহিনী রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, জনআস্থা, মনোবল ও জবাবদিহি পুনর্গঠনের কঠিন সময় পার করছে। তাই তাঁর কথার ওজন সাধারণ কোনো কর্মকর্তার চেয়ে অনেক বেশি। ‘১৭ বছর বঞ্চিত’ বলে আসা প্রত্যেক ব্যক্তির দাবি যে সত্যতা নয়। কেউ হয়তো প্রকৃত বঞ্চিত, কেউ হয়তো সুযোগসন্ধানী। সেজন্যই যাচাই প্রয়োজন। কিন্তু প্রকৃত বঞ্চনার যন্ত্রণা বহনকারী কর্মকর্তাদের কথা শুনতে গিয়ে বিরক্তি যদি এমনভাবে প্রকাশ পায় যে তারা মনে করেন রাষ্ট্র আবারও তাদের প্রত্যাখ্যান করছে, তাহলে সেটিও ইতিবাচক ফল দেবে না। আইজিপির বার্তা হওয়া উচিত তদবির নয়, নিয়মে আসুন; কিন্তু প্রকৃত বঞ্চিত কেউ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন না। এই একটি বাক্যই অনেক ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারে।

অমীমাংসিত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে: দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ক্ষত উপেক্ষা করলে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে হতাশা, দলাদলি, নিষ্ক্রিয়তা ও অনাস্থা বাড়তে পারে। আবার যাচাই না করে শুধু ‘আমি বঞ্চিত ছিলাম’ পরিচয়ে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিলে নতুন বঞ্চনা সৃষ্টি হবে। 

দুই পথই বিপজ্জনক: রাষ্ট্রের নীতি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন—কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, কোনো রাজনৈতিক পুনর্বাসনও নয়। সিদ্ধান্ত হবে মেধা, সততা, পেশাগত দক্ষতা, মানবাধিকার রেকর্ড, জ্যেষ্ঠতা ও প্রমাণের ভিত্তিতে। প্রকৃত বঞ্চিত কর্মকর্তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া অনুগ্রহ নয়; এটি প্রশাসনিক ন্যায়বিচার। আর ক্ষমতার অপব্যবহার বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত করা প্রতিহিংসা নয়; সেটি জবাবদিহি।

শেষ কথা: তদবির বন্ধ করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো ন্যায়সংগত ব্যবস্থা আইজিপির তদবিরবিরোধী অবস্থানকে দুর্বল করার প্রয়োজন নেই। বরং এটিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে একটি স্বচ্ছ বঞ্চনা-নিরসন ব্যবস্থার মাধ্যমে। কারণ তদবিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র কঠোর বক্তব্য নয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে তদবিরের প্রয়োজনই পড়ে না। একজন কর্মকর্তা যদি জানেন তাঁর অভিযোগ নথিভিত্তিকভাবে শোনা হবে, নির্দিষ্ট সময়ে সিদ্ধান্ত হবে এবং যোগ্য হলে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ফিরবে, তাহলে তাঁকে কোনো রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী কর্মকর্তা কিংবা আইজিপির অফিসের দরজায় ঘুরতে হবে না। শেখ হাসিনা আমলের কর্তৃত্ববাদী ও দলীয়করণের যে ক্ষত পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বহন করছে, সেটির সমাধান হতে হবে ন্যায়বিচার ও সংস্কারের মাধ্যমে নতুন দলীয়করণের মাধ্যমে নয়। তাই আজকের বিতর্ক শুধু ‘আইজিপি কেন বিরক্ত হলেন’এই প্রশ্নে আটকে রাখা ঠিক হবে না।

বড় প্রশ্নটি হলো: ১৭ বছরের বঞ্চনার দাবি যদি সত্য হয়, রাষ্ট্র তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও নিরপেক্ষ বিচার কেন নিশ্চিত করবে না? আর আমরা কি এমন একটি পুলিশ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারব, যেখানে ন্যায়বিচার পেতে তদবির লাগে না এবং গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যও লাগে না? এই প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তরই নির্ধারণ করবে পুলিশ সংস্কার সত্যিকার অর্থে হচ্ছে, নাকি পুরোনো সমস্যাগুলো কেবল নতুন নামে টিকে থাকছে।

(লেখক-জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ অব:)

সিয়াম সরিষা
Link copied!