৪১৮ জনের ভাগ্যবদল, নেপথ্যে শতকোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ

মোহাম্মদ রাশেদ , কক্সবাজার জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:১৭ এএম

৪১৮ জনের ভাগ্যবদল, নেপথ্যে শতকোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ

ফাইল ফটো

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের বিশাল ভবনে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নানা বার্তা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ঘিরে উঠেছে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ। বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিতে নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থল ও পদ পাওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি ৪১৮ ডেপুটি রেঞ্জারের পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বন অধিদপ্তরে রেঞ্জ কর্মকর্তা, স্টেশন কর্মকর্তা ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে বদলি বা পদায়নের জন্য নির্দিষ্ট ‘রেট’ রয়েছে। দুই বছরের জন্য রেঞ্জ কর্মকর্তা হতে শ্রেণিভেদে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা, স্টেশন কর্মকর্তা পদে এক বছরের জন্য ৫ থেকে ২০ লাখ এবং ডিএফও পদে দুই বছরের জন্য ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগের কথাও দুদকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পদোন্নতির তালিকায় জ্যেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন: ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের এক আদেশে ৪১৮ ডেপুটি রেঞ্জারের পদোন্নতির তারিখ ভূতাপেক্ষভাবে ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর ফলে দীর্ঘদিন চাকরিতে থাকা অনেক কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতা হারিয়েছেন এবং তুলনামূলকভাবে জুনিয়ররা তালিকায় এগিয়ে গেছেন।

বিধি অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে ডেপুটি রেঞ্জার হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালনের পর ফরেস্ট রেঞ্জার পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের কথা। অথচ পদোন্নতির নয় মাসের মধ্যেই ৪৫৪ জনের মধ্যে ২৮৯ জনকে রেঞ্জার পদে পদোন্নতির জন্য পিএসসিতে সুপারিশ পাঠানো হয় বলে অভিযোগ।

আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতে ১০, ১৫, ২০ বা ২৫ বছর পর্যন্ত চাকরিকাল বিবেচনার সুযোগ থাকার কথা বলা হলেও কর্তৃপক্ষ মাত্র পাঁচ বছর বিবেচনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ২০০০, ২০০৪ ও ২০০৫ সালে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারাও ২০১৪ সালে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

তালিকার ভেতরেও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। ২৫৫ থেকে ৩১৭ নম্বর পর্যন্ত ৬৩ জনকে মাত্র ৬ বছর ৩ মাস ১২ দিনের চাকরিকালের পর পদোন্নতি দেওয়া হলেও ১৬৯ থেকে ২৫৪ নম্বর পর্যন্ত ৮৬ জনের প্রকৃত পদোন্নতির তারিখ অনেক আগের হওয়া সত্ত্বেও একই তারিখ বসানো হয়েছে। এমনকি একজন কর্মকর্তাকে মাত্র ২ বছর ১১ মাস ১১ দিনের মাথায় ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তারাও পদোন্নতির তালিকায়: পদোন্নতির তালিকায় বিভাগীয় মামলা, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা শাস্তির ইতিহাস থাকা একাধিক কর্মকর্তার নাম রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

তালিকার ৭২ নম্বরে থাকা মনিরুল করিম একসময় চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান থাকার কথা বলা হয়েছে। ১০৭ নম্বরে থাকা সাদিকুন মাহমুদের বিরুদ্ধে অবৈধ হরিণ শিকার ও মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

২০৬ নম্বরে থাকা চিন্ময় মধুর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলমান। তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ১৪৪ ভরি স্বর্ণ ও এক কোটি ৪২ লাখ টাকা জব্দ করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

২৩৪ নম্বরে থাকা খান জুলফিকার আলীর বিরুদ্ধে বান্দরবানের লামা তৈন রেঞ্জে এক হাজার একর সেগুন বাগানের গাছ বিক্রির অভিযোগ ছিল। ৩০৫ নম্বরে থাকা আমিরুল হাসানকে ২০১৪ সালে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি চাকরিতে ফিরে এসে নির্ধারিত পাঁচ বছরের আগেই পদোন্নতি পান বলে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২৭৩ নম্বরে থাকা সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে সামাজিক বনায়নের গাছ বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যেও কার্যক্রম?

ডেপুটি রেঞ্জারদের গ্রেডেশন নিয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে একাধিক মামলা বিচারাধীন। অভিযোগ রয়েছে, আপিল বিভাগের অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থাতেও গ্রেডেশন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গত ১০ মে আপিল বিভাগের জাজ-ইন-চেম্বার স্থগিতাদেশ দেওয়ার পর ১২ মে বন বিভাগ থেকে চিঠি জারি এবং ১৪ মে খসড়া গ্রেডেশন নিয়ে শুনানি করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগও উঠেছে। তবে বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদালতের ভ্যাকেট আদেশের পরই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

দুদকের অভিযানেও মিলেছে অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি

২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বন অধিদপ্তরে অভিযান চালায় দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম। ২৬ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বদলি ও পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বদলি-পদায়ন নীতিমালা ২০০৪ অনুসরণ না করে অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে কর্মকর্তাদের পদায়নের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সুফল প্রকল্পেও বাস্তবে বনায়ন না করে অর্থ ব্যয়, সীমিত এলাকায় চারা রোপণ এবং শুধু সাইনবোর্ড স্থাপনের মতো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়।দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, সুফল প্রকল্পের নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বিশ্লেষণের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক- লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন- মঈদুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা মিললে দুদকের সরাসরি মামলা করার সুযোগ রয়েছে, মামলা দায়েরের পরও তদন্ত চালানো সম্ভব।তিনি বলেন, ‘অভিযোগ দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে বিষয়টি ম্যানেজ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, একপর্যায়ে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে।’টিআইবির সদস্য মো. মাজেদুল হকও অভিযোগ অনুসন্ধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।

বন অধিদপ্তরের বক্তব্য

অভিযোগ অস্বীকার করে সিএফ (অ্যাডমিন) এস এম মনিরুল ইসলাম সময়ের কণ্ঠস্বরকে বলেন, ‘সব নিয়মকানুন মেনেই গ্রেডেশন তালিকা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন হুমায়ুন কবির সাহেব।

ডিসিএফ হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আইন অনুযায়ী তালিকায় সবার নাম রাখতে হয়। সেই মোতাবেক সবার নাম রেখেই আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে মামলা কিংবা অভিযোগ রয়েছে, তাও উল্লেখ করে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। এখন সেগুলো যাচাইয়ের দায়িত্ব পিএসসির। তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন মামলা চলমান ছিল, ততদিন এই কার্যক্রম বাক্সবন্দি করে রেখেছিলাম। আদালত ভ্যাকেট আদেশ দেওয়ার পরই সব জায়গায় নোটিশ পাঠিয়ে তালিকাটি করে পাঠানো হয়েছে।’

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, ‘গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করে সবার কাছে নোটিশ পাঠানো হয়, নোটিশে উল্লেখ থাকে- কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তা জানাতে। এতে প্রায় ৬৪টির মতো আবেদন পেয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে বসে কী কী কারণে তারা পিছিয়ে পড়েছেন, তা আইনিভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘তালিকা পাঠানো হলেও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তারা পদোন্নতি পাবেন না।’

অন্যদিকে, প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গেলে তিনি প্রতিবেদককে বক্তব্য দেবেন না বলে জানান। বন অধিদপ্তরের পদোন্নতি, বদলি ও পদায়ন ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!