ময়মনসিংহ নগরীতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আলিশান ভবন, ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট ও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, ক্যাশিয়ার, হিসাবরক্ষক, ভূমি কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি অংশ অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন।
দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর অনুসন্ধানে জানাগেছে, ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরে দীর্ঘদিন কর্মরত ১৪৩ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর মধ্যে ৬৭ জনের সর্বনিম্ন ৫ কোটি টাকার ওপরে সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
তাদের কারও কারও সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে শতকোটি টাকায় পৌঁছেছে বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে এসব সম্পদের বৈধ উৎস ও আয়কর নথির সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
নগরীর গোলকিবাড়ি, আকুয়া মড়লপাড়া (হাজীবাড়ি), আমলাপাড়া, মাসকান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মালিকানায় অন্তত ৪৯টি বহুতল ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে। আরও শতাধিক ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
সম্প্রতি এসব অভিযোগ নিয়ে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আবুল খায়ের নামে এক ব্যক্তি জনস্বার্থে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান চলছে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ নগরীর গোলকিবাড়ি এলাকায় আভিজাত্যে মোড়া ১১ তলা ‘স্বপ্ন টাওয়ার’ এবং আকুয়া হাজীবাড়ি মোড়ের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং টাওয়ার’, ‘ইব্রাহিম টাওয়ার’ ও ‘ইউলিটি টাওয়ার’সহ কয়েকটি বহুতল ভবন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ভবনের মালিকানা ও নির্মাণের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ জড়িত। তাদের মধ্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হক, সমবায় কমকর্তা মোঃ কামরুজ্জামান, ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল গনি, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহীন আলম এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামসহ ৬৭ জনের নামও আলোচনায় এসেছে।
এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফারজানা পারভিন, সাবেক সহকারী পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক সহকারী পরিচালক মো. জোয়াহের আলী মিয়া, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নন্দন কুমার দেবনাথ, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আবু জুলহাস, সাবেক যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ এবং গোলাম মোস্তফাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধেও বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তারাকান্দা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্যাশিয়ার মো. এনামুল হকসহ ১৮ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির যৌথ মালিকানায় গোলকিবাড়ি এলাকায় একটি ১১ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে ভবনটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২৪ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছে। ভবনটির জমি ক্রয় ও নির্মাণ ব্যয়ের অর্থের উৎস কী—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এনামুল হক অবশ্য দাবি করেছেন, তারা ২০১১ সালে ১৮ জন মিলে ছয় শতাংশ জমি ক্রয় করেন এবং পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ভবনটি নির্মাণ করেছেন।
এ ছাড়া নেত্রকোনা জেলা কারাগারের জেল সুপার আব্দুল্লাহ ইবনে তোফাজ্জল হোসেন খানের সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার একাধিক বাড়ি রয়েছে এবং নগরীর জামতলা মোড়ে ছয় শতাংশ জমির ওপর সাততলা একটি ভবন নির্মাণাধীন। নগরীর বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি জমি কেনার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের এবং আদালতের নির্দেশে দুদকের অনুসন্ধানের কথাও জানা গেছে। মামলার আবেদন যার নং- ০১/২০২৩, দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার উল্লেখ রয়েছে। ৩২ কোটি টাকার দুই ১১ তলা ভবনের অভিযোগ। উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত সাদেকুল ইসলামের সম্পদ নিয়েও অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে প্রতিদিনের কাগজ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ময়মনসিংহ নগরীর আমলাপাড়া ও গোলকিবাড়ি এলাকায় প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ১১ তলা ভবন এবং ৪৫ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। জমি ক্রয়ের দলিল হিসেবে ১২০, ২৩০৭, ৫৬৯, ৭০৪, ৭০০ ও ৫৪৫ নম্বরের উল্লেখ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রাজধানীর উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে পাঁচ শতক জমির ওপর নয়তলা বাড়ি এবং উত্তরা, ধানমন্ডি ও ময়মনসিংহের আমলাপাড়া ও গোলকিবাড়িতে আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সাদেকুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী সোনিয়া আক্তার অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামী দুর্নীতির মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করেছেন। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, হাসপাতাল ও ভূমি অফিসেও অভিযোগ
ময়মনসিংহ অঞ্চলে নদী খনন প্রকল্পে অনিয়ম নিয়ে ‘সাগর চুরি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপুল সম্পদের বিষয়টি সামনে এসেছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী, হিসাবরক্ষক, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধেও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের সার্ভেয়ারসহ পাঁচ কর্মকর্তার ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ভূমি কর্মকর্তা তাপস চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধেও দেশে-বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে ভারতে একাধিক বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের বিদেশে বসবাস ও পড়াশোনার তথ্য দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সম্পত্তি ও আর্থিক নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
দুদকের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সমবায় কমকর্তা মোঃ কামরুজ্জামান, শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্যাশিয়ার এনামুল হকের সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ময়মনসিংহে আরও বহু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্য সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন কর্মচারীর ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমি কেনার তথ্যও অনুসন্ধানে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফুলপুরের বওলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল বাতেন খানের বিরুদ্ধেও বিপুল অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের আত্মীয়—এমন দাবি করে অভিযোগকারীরা তার ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
‘ময়মনসিংহেও বেগমপাড়া?’
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী ড. আজীম বিল্লাহ জয়নাল।
তিনি বলেন, এতদিন কানাডায় ‘বেগমপাড়া’ কিংবা লন্ডনে ‘বেগমপাড়া’র কথা শোনা গেছে। এখন ময়মনসিংহ নগরীতেও যদি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্থে এমন সম্পদের বলয় গড়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন :