বিল্লাল হোসেন মানিক/ জামাল উদ্দিন খান সরাইল থেকে ফিরে : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের পীর বাড়ি এলাকায় ১৬ বছরের কিশোর এনায়েত উল্লাহ ওরফে ভুট্টুর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। দুইটি হাঁস চুরির অভিযোগে কিশোরটিকে ধরে নিয়ে মারধর, পরে নদীর পাড়ে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন নিহতের স্বজনরা। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, কিশোরকে নির্যাতন করে হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে প্রচারের উদ্দেশ্যে মরদেহ নদীর পাড়ের একটি পরিত্যক্ত বয়লার মাঠের ভাঙা দেয়ালের রডের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আবেদনের বিবরণ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১ মার্চ ২০২৬ সকালে পীর বাড়ি গ্রামের মৃত এনায়েত উল্লাহর ১৬ বছর বয়সী ছেলে এনায়েত উল্লাহ ওরফে ভুট্টুকে দুইটি হাঁস চুরির অভিযোগে কয়েকজন ব্যক্তি ধরে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন পরিবারের সদস্যরা।
অভিযোগে স্থানীয় ফরিদ মিয়া ওরফে ফরিদ মেম্বার, লালু মিয়া ও মাহমুদ আলীসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, কিশোর এনায়েত উল্লাহকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর সে নিখোঁজ হলে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, ওই সময় প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ভয়ভীতি দেখান এবং কিশোরের অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন।
পরদিন মিলল ঝুলন্ত মরদেহ: পরদিন ২ মার্চ সরাইল থানা পুলিশ নদীর পাড়ে একটি পরিত্যক্ত বয়লার মাঠের ভাঙা দেয়ালের রডের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতের মামা মো. আশিদ মিয়ার দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়; কিশোরকে মারধর করে হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে দেখাতে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—হত্যা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো ঘটনা—তা নির্ধারণের জন্য ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুরতহাল প্রতিবেদন নিয়েও অভিযোগ: ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদনকে ঘিরে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠ স্বজনদের উপস্থিতি ও বক্তব্য যথাযথভাবে না নিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবের কারণে একটি একপেশে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এমনকি অভিযুক্তদের আত্মীয়-স্বজনদের সাক্ষী করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অর্থের বিনিময়ে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
মামলা হলেও গ্রেপ্তার নেই প্রশ্ন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে: ঘটনার পর সরাইল থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তথ্য অনুযায়ী, জি.আর. ৭৯/২৬ এবং মামলা নং-০৮, তারিখ ৩ মার্চ ২০২৬। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সরাইল থানার সাব-ইনস্পেক্টর (নিঃ) মো. ইউনুছ মিয়ার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। তাদের দাবি, মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিরা এলাকায় প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাদের গ্রেপ্তারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তদন্তে বিলম্বের পাশাপাশি অভিযুক্তদের সঙ্গে পুলিশের অনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে।
পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন: সরাইল থানা পুলিশের তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিহতের মামা মো. আশিদ মিয়া ২৯ মার্চ ২০২৬ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে সরাইল থানা থেকে মামলার তদন্ত সরিয়ে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) অথবা অন্য কোনো নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানানো হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তদন্তে দেওয়ার কথা জানা গেছে। এতে স্বজনদের দীর্ঘদিনের একটি প্রধান দাবি স্থানীয় থানা পুলিশের বাইরে নিরপেক্ষ তদন্ত—বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি: ঘটনাটি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে ১. কিশোরকে সত্যিই হাঁস চুরির অভিযোগে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কি না? ২. তাকে কোথায় এবং কারা নিয়ে গিয়েছিল? ৩. তার শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল কি না এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে? ৪. যে স্থানে মরদেহ পাওয়া যায়, সেখানে কিশোর নিজে গিয়ে আত্মহত্যা করার সুযোগ ও পরিস্থিতি ছিল কি না? ৫. মরদেহ উদ্ধারের আগে ও পরে কারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন? ৬. সুরতহাল প্রতিবেদনে কারা সাক্ষী ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে নিহতের পরিবারের সম্পর্ক কী? ৭. পরিবারের সদস্যদের কেন শুরুতেই অবহিত করা হয়নি যদি সত্যিই এমনটি হয়ে থাকে? ৮. মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তে কী কী আলামত পাওয়া গেছে? ৯. অভিযুক্তদের কেউ কেন এখনো গ্রেপ্তার হয়নি—যদি তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের মতো উপাদান থেকে থাকে? ১০. থানার প্রাথমিক তদন্তে কোনো গাফিলতি বা অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় কার? ১১. ভিডিও আলামতে দেখানো হয়েছে কিনা?
আসামিপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা: প্রতিবেদনের ভারসাম্য বজায় রাখতে মামলার অন্যতম আসামি লালু মিয়ার বক্তব্য জানতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।তার কাছে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে কোনো লিখিত উত্তর দেননি। তবে প্রতিবেদককে তিনি সরাসরি তার বাড়িতে গিয়ে বক্তব্য নেওয়ার কথা জানান।
এখন নজর পিবিআই তদন্তে : একজন ১৬ বছর বয়সী কিশোরের মৃত্যু—আর সেই মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, তা নিয়ে স্বজনদের গুরুতর অভিযোগ ঘটনাটিকে নিছক একটি স্থানীয় মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত, ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের তথ্য, কিশোরকে শেষবার কারা দেখেছিল এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। আদালতের নির্দেশে তদন্ত পিবিআইয়ের হাতে যাওয়ায় এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, কোনো পক্ষের প্রভাব বা চাপ ছাড়াই তদন্তটি সম্পন্ন হবে এবং কিশোর এনায়েত উল্লাহ ওরফে ভুট্টুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে। হাঁস চুরির অভিযোগটি সত্য ছিল কি না, কিশোরের ওপর নির্যাতন হয়েছিল কি না এবং তার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে।

আপনার মতামত লিখুন :