ময়মনসিংহ রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত ঘিরে অভিযোগ; ভেটিং ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন। পুলিশের থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদায়নের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট নীতিমালা। কে ওসি হতে পারবেন, কোথায় পদায়ন করা যাবে না, একজন কর্মকর্তা একই থানায় পুনরায় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না—এসব বিষয়ে নীতিমালায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে । কিন্তু বাস্তবে সেই নীতিমালা কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে ।
ময়মনসিংহ রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আতাউল কিবরিয়ার সময়ে নেওয়া কয়েকটি পদায়ন ও বদলি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘিরে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ কিছু শর্ত উপেক্ষা করে একজন কর্মকর্তাকে একই থানায় দ্বিতীয়বার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যদি অভিযোগটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—ওসি পদায়নের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল, দায়িত্ব পালনের ইতিহাস, শাস্তির রেকর্ড ও অন্যান্য যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছিল কি না।
নীতিমালা আছে, বাস্তবায়ন কতটা?
পুলিশের ওসি পদায়নসংক্রান্ত ২২ দফা নীতিমালায় কর্মকর্তার যোগ্যতা ও পদায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা একবার কোনো থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে তাকে একই থানায় পুনরায় ওসি করা যাবে না। ওসি হওয়ার জন্য পরিদর্শক (নিরস্ত্র) পদে ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে । নিজের জেলা কিংবা স্ত্রী/স্বামীর জেলায় ওসি পদায়নের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে ।
এ ছাড়া ৫৪ বছরের বেশি বয়সী কর্মকর্তাকে ওসি পদে পদায়ন না করা, কর্মকর্তার শাস্তির রেকর্ড, এসিআর, প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা ও সার্বিক সার্ভিস রেকর্ড বিবেচনা করার বিধান রয়েছে । প্রশ্ন হলো—এই নীতিমালার প্রতিটি শর্ত কি বাস্তবে যাচাই করে তারপর পদায়ন করা হচ্ছে? একই থানায় দ্বিতীয়বার—নথিতে কী আছে? অনুসন্ধানে আলোচনায় আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগটি হলো, একজন কর্মকর্তাকে একই থানায় দ্বিতীয়বার ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ।
পুলিশের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোনো কর্মকর্তাকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়নের আগে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল ও দায়িত্ব পালনের তথ্য যাচাই করার কথা। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আগে ওই থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, করলে কখন এবং কতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন—এসব তথ্য পদায়নের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কারণ, যদি একই থানায় দ্বিতীয়বার ওসি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—নীতিমালার সংশ্লিষ্ট ধারা কি পদায়নকারী কর্তৃপক্ষের নজরে ছিল না? নাকি কোনো বিশেষ প্রশাসনিক বিবেচনায় তা পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল?
জামালপুরে বদলি-পদায়নেও অভিযোগ: ময়মনসিংহ রেঞ্জের আওতাধীন জামালপুর জেলার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বদলি নিয়েও অভিযোগ উঠেছে অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু কর্মকর্তাকে যথাযথ প্রশাসনিক কারণ ছাড়াই বদলি করা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তাকে রেঞ্জের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে । তাদের আরও অভিযোগ, একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। কারও ক্ষেত্রে দ্রুত বদলি, আবার কারও ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রাখার ঘটনায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি । ময়মনসিংহ রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ‘একচোখা নীতি’ অনুসরণের অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একই ধরনের অভিযোগ বা প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন আচরণ করা হয়েছে। কেউ হয়েছেন বদলি, কেউ পেয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—এমন বৈপরীত্যের অভিযোগও রয়েছে।
ভেটিং প্রক্রিয়া কতটা নির্ভরযোগ্য?
পুলিশের ভেটিং প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের নামে কোনো কর্মকর্তাকে হয়রানি করা হয়েছে কি না, কিংবা একই ব্যক্তির বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য কীভাবে প্রতিবেদনে এসেছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে ।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো কর্মকর্তার বিষয়ে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধরনের ভেটিং প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো—তথ্যের উৎস কী ছিল? কোন প্রতিবেদনকে সঠিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল? আর ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকলে এর দায় কে নেবে?
পুলিশ সদর দপ্তরের নজরে কি বিষয়টি?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ময়মনসিংহ রেঞ্জের কিছু বদলি, পদায়ন ও ভেটিং-সংক্রান্ত অভিযোগ পুলিশ সদর দপ্তরে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।অভিযোগগুলো যাচাই করে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে তদন্ত বা পর্যালোচনা শেষ হওয়ার আগে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে অনিয়মের জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগত ও নৈতিকভাবে সমীচীন নয় ।
এখন মূল প্রশ্ন পাঁচটি
এক. ওসি পদায়নের ২২ দফা নীতিমালা কি বাস্তবে কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে?
দুই. একই থানায় দ্বিতীয়বার ওসি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকলে, সেই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক ভিত্তি কী ছিল?
তিন. বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কারণগুলো কি লিখিতভাবে নথিভুক্ত ছিল?
চার. ভেটিং প্রতিবেদনে অসঙ্গতি থাকলে তার দায় নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি?
পাঁচ. তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
নীতিমালা মানার দায়িত্ব কার?
পুলিশের একটি থানার নেতৃত্ব শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়; এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনগণের নিরাপত্তা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টি সরাসরি জড়িত । তাই ওসি পদায়নে কোনো ধরনের ব্যতিক্রম, পক্ষপাত বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন । একইভাবে বদলি-পদায়ন ও ভেটিংয়ের ক্ষেত্রেও থাকতে হবে অভিন্ন মানদণ্ড।নীতিমালা যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তাহলে তার প্রয়োগও হতে হবে সমানভাবে। আর যদি কোনো ব্যতিক্রমের প্রয়োজন হয়, তার কারণও হতে হবে স্পষ্ট, লিখিত ও যাচাইযোগ্য।
ময়মনসিংহ রেঞ্জের সাবেক ডিআইজির সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও এখন মূল বিষয় ব্যক্তি নয়—নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সিদ্ধান্তের পেছনে প্রশাসনিক যুক্তি কী ছিল এবং সব কর্মকর্তার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে কেবল একটি পদায়ন বা বদলি নিয়ে বিতর্কের অবসান হবে না; বরং পুলিশের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টিও আরও পরিষ্কার হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—নীতিমালা কি মাঠপর্যায়ে কার্যকর, নাকি তা শুধু সরকারি নথির পাতাতেই সীমাবদ্ধ?

আপনার মতামত লিখুন :