রংপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী মুসার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩১ এএম

রংপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী মুসার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

ফাইল ফটো

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, টেন্ডার বাণিজ্য, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে তিনি রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর লালমাটিয়ার ব্লক-এ এলাকার ৬/৪ ও ৬/১১ নম্বর মমনেট বিল্ডিংয়ের লিফটের চতুর্থ তলায় ৪-এ নম্বর ফ্ল্যাটে প্রায় ১ হাজার ৭০০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন মো. মুসা। ফ্ল্যাটটির মূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মো. মুসা জানান, ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে তিনি ফ্ল্যাটটি কিনেছেন। তবে কোন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন কিংবা ঋণটি কার নামে— এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি।

২০২৪ সালের ১ আগস্ট রংপুর এলজিইডিতে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক, সেতু নির্মাণ ও সরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ঠিকাদারদের একটি অংশের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কয়েকজনের দাবি, কিছু প্রকল্পে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন লেনদেনের প্রচলন রয়েছে। রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পেও মো. মুসার বিরুদ্ধে একই ধরনের পার্সেন্টেজ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

২০২৫ সালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হরিনাবাড়ী বাজার পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পের কাজের মান, প্রকৌশলগত তদারকি এবং বিল ছাড়ের বিষয়ে তৎকালীন রংপুর বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পটি যথাযথভাবে যাচাই না করেই বিল ছাড় করা হয়।

এদিকে, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আখতার হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে মো. মুসা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও পদায়নের সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালে তিনি তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর সহকারী প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে রংপুরে যোগ দেন।

এছাড়া Municipal Governance and Services Project (MGSP)-এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অর্থের অনিয়মের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আখতার হোসেনের নিয়োগ, বদলি ও কমিশন বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও মো. মুসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে পিরোজপুরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করেই বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। ওই বিষয়ে মো. মুসার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট কেনা এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মো. মুসার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ফ্ল্যাটের বিষয়ে ব্যাংক ঋণের কথা বললেও বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে করা একাধিক প্রশ্নেরও তিনি সন্তোষজনক জবাব দেননি।

এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো একাধিক প্রশ্নেরও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তার আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য, ফ্ল্যাট কেনার অর্থের উৎস এবং সরকারি প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

Link copied!