ঘন ঘন বদলিতেও অস্থিরতা

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

ঘন ঘন বদলিতেও অস্থিরতা

ফাইল ফটো

ঘন ঘন বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর ও পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পুলিশের অনেক কর্মকর্তা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে এ উদ্বেগ বেশি। তাদের আশঙ্কা, পেশাগত সিদ্ধান্ত বা আগের পদায়নকে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার সঙ্গে মিলিয়ে ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

পরিদর্শক থেকে ডিআইজি পদমর্যাদার কয়েক ডজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বদলিতে বাড়ছে উদ্বেগ

জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, একটি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বুঝতে, তথ্যের নেটওয়ার্ক তৈরি করতে এবং স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে সময় প্রয়োজন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই বদলি হলে সেই ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।

ফেনীর পুলিশ সুপারকে নিয়োগের পরপরই সরিয়ে দেওয়া এবং পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বদলির ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন কর্মকর্তারা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, বারবার বদলি হলে কর্মকর্তাদের নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। বিশেষ করে গ্রাম ও মহানগরের মতো ভিন্ন ধরনের এলাকায় বদলি হলে এই সমস্যা আরও বেশি হয়।

সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের কাঠামোতে পরিবর্তনের কারণে বদলি স্বাভাবিক। তবে নির্দোষ কর্মকর্তারা যেন এর শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

অবসর নিয়েও আতঙ্ক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় করা মামলায় পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের নাম এসেছে। এ ছাড়া ১৪১ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ১৪২ জনকে ওএসডি বা অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে এবং পলায়নের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ৯৩ জন।

বর্তমান সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে ৬৭ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ মে ১৭ জন, ৫ জুলাই ৩৩ জন এবং ২৩ জুলাই ১৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য দায়ীদের অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। তবে শুধু কোনো সরকারের সময়ে চাকরি করা বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করাই যেন ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ না হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিদর্শক বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে আমাদের এখন দশ বার ভাবতে হয়। সরকার বদলে গেলে কী হবে? আমাদেরও কি জোর করে অবসরে পাঠানো হবে বা পরে শাস্তি দেওয়া হবে? তখন কি কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে?

অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম অভিযোগ নাকচ করে বলেন, গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

পদোন্নতিতেও অনিশ্চয়তা

২০২৩ সালের নভেম্বরে ১৪০ জন পুলিশ সুপারকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৯ জন নিয়মিত পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। শতাধিক কর্মকর্তা এখনো নিয়মিত পদায়নের অপেক্ষায়।

একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, নিয়মিত পদে পদায়নের বদলে আমাদের অতিরিক্ত পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমাদের অনেকেই এখনো নিয়মিত পদে দায়িত্ব পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, পেশাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতির ব্যবস্থা করা জরুরি।

পেশাদার কাঠামোর দাবি

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল ধীরে ধীরে ফিরছে। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় পুলিশের পেশাগত সক্ষমতা ও শৃঙ্খলা দুর্বল হলে জননিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, পুলিশের মূল সমস্যা হলো একটি স্বাধীন ও পেশাদার কাঠামো গড়ে তুলতে না পারা। পুলিশ কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং পুলিশে রাজনৈতিক প্রভাব চলতে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশকে ব্যবহার করার প্রবণতা থেকেই যাবে।

তার মতে, নির্দিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে নির্বিচারে জোর করে অবসরে পাঠানো ঠিক নয়। এতে পুলিশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একজন ডিআইজি বলেন, পুলিশের ভেতরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি। নইলে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

সিয়াম সরিষা
Link copied!