রাজধানীর উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আনুমানিক ২০-২১ কাঠা সরকারি জমি দখল করে অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে মজিবুর রহমান ওরফে ‘প্রতিবন্ধী মজিবর’-এর বিরুদ্ধে। মানবিক পরিচয় ও শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রায় ৬০ কোটি টাকার টাকার সরকারি সম্পত্তি দখল এবং বিদ্যুৎ-পানির অবৈধ সংযোগ নিয়ে ঘর ভাড়া দিয়ে মাসিক লাখ লাখ টাকা বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য ও আয়ের হিসাব :
উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের ব্লক-এ, বি ও ডি এলাকার লেকপাড় জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এই দখলদারিত্ব।
দখলকৃত জমির পরিমাণ ও মূল্য: রাজউকের প্রায় ২০-২১ কাঠা জমি, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৬০ কোটি টাকা।
স্থাপনার সংখ্যা: ৬০টিরও বেশি টিনশেড দোকান ও বসতঘর।
ভাড়া বাণিজ্য: প্রতিটি ঘর ও দোকান থেকে মাসে ২,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা আদায় করা হয়। প্রতি মাসে মোট ভাড়া ওঠে প্রায় ১০ লাখ টাকা, যা বছরে প্রায় ৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
অবৈধ পানির সংযোগ ও ওয়াসার পদক্ষেপ :
উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা ওয়াসার জোন-১০ তদন্ত পরিচালনা করে।
তদন্তের ফলাফল: ১৫ নম্বর সেক্টরের বি-ব্লকে ওয়াসার পানির পাম্প কম্পাউন্ডের পশ্চিম পাশে অননুমোদিত টিনশেড ঘরে অবৈধ পানির সংযোগের প্রমাণ মেলে। এছাড়া একটি বৈধ পানির মিটার বাইপাস করে হোটেল ও মুদি দোকানে সংযোগ দেওয়ার সত্যতা পাওয়া যায়।
আইনি ব্যবস্থা: ওয়াসার দল অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে স্থানীয় বাধার সম্মুখীন হয়। ফলে সরকারি রাজস্ব ও নিরাপদ পানি সরবরাহ রক্ষায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ঢাকা ওয়াসা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন জানিয়েছে।
রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান ও আলটিমেটাম অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক (জোন-১) উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে।
অভিযানের বর্তমান অবস্থা: লেকসংলগ্ন বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
বিশেষ ছাড় ও সময়সীমা: অভিযুক্ত মজিবুর রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে স্থায়ীভাবে থাকার আবেদন জানালেও তা নামঞ্জুর হয়। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে দুই মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষে পুনরায় অভিযান চালিয়ে অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি অপসারণ করা হবে।
প্রভাব ও ছদ্মবেশের অভিযোগ :
স্থানীয় অধিবাসীদের দাবি, মজিবুর নিজেকে 'প্রতিবন্ধী' পরিচয় দিয়ে আবেগ সৃষ্টি করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন প্রভাবশালী ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। সাবেক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি এই জমি দখল করেন। উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গেলেই তিনি প্রতিবন্ধী কার্ড বা শারীরিক অক্ষমতার দোহাই দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা চালান। পাশাপাশি উক্ত এলাকায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং মাদক কারবারের বিস্তারের মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।
কোটি টাকার সরকারি জমি কীভাবে বছরের পর বছর ধরে এক ব্যক্তির দখলে রইল এবং ইউটিলিটি সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে কীভাবে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হলো—তা নিয়ে এখন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রাশাসনিক মোবাইল কোর্ট ও রাজউকের চূড়ান্ত পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন উত্তরাবাসী।
এ বিষয়ে মজিবুর রহমান জানান, তিনি সরকারি জায়গায় বসবাস করেন— এটি সত্য। তবে তার দাবি, তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে ওই স্থানে বসবাস করে আসছেন এবং সেখানে আরও অনেকেই বসবাস করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে তার কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই।
মজিবুর রহমান বলেন, প্রতিদিনের কাগজ অনলাইন সংবাদে তার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি তার আইনজীবীর মাধ্যমে একটি প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছেন। তিনি অনলাইন থেকে সংবাদটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানান এবং তার পাঠানো প্রতিবাদপত্রটি প্রকাশের অনুরোধ করেন।
পরবর্তীতে মজিবুর রহমানের পক্ষে একটি পত্রিকার বার্তা সম্পাদক পরিচয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই প্রতিবাদপত্রটি প্রকাশের অনুরোধ জানানো হয়।
উল্লেখ্য, মজিবুর রহমানের বক্তব্য ও প্রতিবাদ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন সংবাদ প্রকাশের তথ্যের সাথে কোন মিল পাওয়া যায়নি।

আপনার মতামত লিখুন :