মামলা-বরখাস্ত-অপসারণ, তবুও সিডিএ’তে বহাল হাসানকে ঘিরে এত প্রশ্ন কেন?

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম

মামলা-বরখাস্ত-অপসারণ, তবুও সিডিএ’তে বহাল হাসানকে ঘিরে এত প্রশ্ন কেন?

ফাইল ফটো

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একাধিক দুর্নীতি মামলার আসামি হওয়া, সাময়িক বরখাস্ত, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে অপসারণ এবং নতুন করে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ— সব মিলিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার-১ মোহাম্মদ হাসান।

তার বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলা দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন। পাশাপাশি ভবন নকশা অনুমোদন, তলা বৃদ্ধি, সংশোধিত নকশা অনুমোদন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।

এসব অভিযোগ ঘিরে সিডিএর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোও বিচারাধীন।

কালুরঘাট প্রকল্পে দুদকের মামলা

আদালত সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে ৪০/২০১২, ৪১/২০১২ ও ৪৩/২০১২ নম্বর বিশেষ দুর্নীতি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

দুদক ২০১০ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ২৮ হাজার ৪৫২ টাকা আত্মসাত ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। তদন্ত শেষে ২০১২ সালের মে মাসে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির আশ্রয় নেন। এসব মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিন নিয়ে মামলা পরিচালনা করে আসছেন।

মামলার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব মামলা বিচারাধীন থাকার সময়েও মোহাম্মদ হাসান সিডিএর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। একপর্যায়ে তিনি অথরাইজড অফিসার-১-এর দায়িত্ব পান।

সিডিএর উন্নয়ন ও ভবন নির্মাণসংক্রান্ত বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অথরাইজড অফিসারের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। ভবনের নকশা অনুমোদন, সংশোধিত নকশা, তলা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে এ পদটি সরাসরি সম্পৃক্ত।

এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি মামলা চলমান থাকা অবস্থায় একজন কর্মকর্তা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদন-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে বহাল ছিলেন—এ প্রশ্নই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।

নকশা অনুমোদন নিয়ে নানা অভিযোগ

সিডিএর অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, ভবন নকশা অনুমোদন, অনুমোদিত তলার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, নকশা পরিবর্তন এবং ভবন বিধিমালা লঙ্ঘনের ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক নমনীয়তার অভিযোগ উঠেছে।

কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হয়েছে। সম্প্রতি নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত একটি ঘটনায় বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে কোন ভবন, কোন নকশা বা কোন অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে— তা নির্দিষ্টভাবে যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের পক্ষে লিখিত নথি, আবেদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য কিংবা তদন্ত প্রতিবেদন থাকলে তা-ই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

সিডিএর কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংস্থাটিতে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় তৈরি হয়েছিল। ওই সময় কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এই অভিযোগের সঙ্গে মোহাম্মদ হাসানের নামও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন।

সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের দায়িত্বকাল নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সিডিএর কার্যক্রম নিয়ে নানা সমালোচনা ও অভিযোগ ওঠে।

তবে মোহাম্মদ হাসানের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পর্ক বা সেই সম্পর্কের কারণে কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়েছে— এমন অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট নথি বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য পাওয়া না গেলে তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সাময়িক বরখাস্ত

এর আগে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর মোহাম্মদ হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করে সিডিএ কর্তৃপক্ষ। সিডিএ চাকরি প্রবিধানমালার ৪০(ঙ) ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সিডিএ সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।

এ ঘটনায় সিডিএর অভ্যন্তরে তার প্রশাসনিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়। অথরাইজড অফিসার-১ পদ থেকে অপসারণ এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোহাম্মদ হাসানকে অথরাইজড অফিসার-১-এর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী কাদের নেওয়াজ।

অথরাইজড অফিসার-১-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সিডিএর প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।

বহদ্দারহাটের মসজিদ নিয়েও প্রশ্ন

প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকায় একটি মসজিদের বহুতল ভবনের অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতাও মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অসন্তোষের অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচিত হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক নথি, অনুমোদনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা তদন্ত প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে না এলে অভিযোগটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা কঠিন।

দুদকের মামলায় আরও কর্মকর্তা

কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পসংক্রান্ত মামলাগুলোতে মোহাম্মদ হাসান ছাড়াও সিডিএর একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা আসামি রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে বলে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অর্থাৎ, মামলাগুলোকে শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে দেখার সুযোগ নেই; বরং প্রকল্প বাস্তবায়ন, অনুমোদন ও তদারকির পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।

জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন

নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন থাকলে তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব পদে নকশা অনুমোদন ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি যেসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন প্রক্রিয়াও প্রয়োজন হলে পর্যালোচনা করা উচিত।

এক দশকের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন দুর্নীতি মামলার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে সাময়িক বরখাস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে অপসারণ—এই ধারাবাহিকতা সিডিএর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কর্মকর্তা অপরাধী কি না, সেটি আদালতের বিষয়। তবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও মামলা থাকলে প্রশাসনিকভাবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কীভাবে ছিলেন— সেটির ব্যাখ্যাও জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।

আর এদিকে দুর্নীতি অনিয়মসহ নানান অভিযোগে অভিযুক্ত প্রকৌশলী হাসানের সাথে এবিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হয়লে তিনি একাধিক বার কল করলেও মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়টি আমিও শুনেছি। তবে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিকভাবে কী করণীয়, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’

এদিকে সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের দাবি, মোহাম্মদ হাসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত বিরোধের ভিত্তিতে নয়, বরং নথিপত্র ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সিডিএর অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

Link copied!