বাংলাদেশ পুলিশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পদোন্নতি ও পদায়ন-বৈষম্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও পুরোপুরি কাটেনি এমন অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনা, আঞ্চলিকতা কিংবা ভিন্নমতের অভিযোগে দীর্ঘদিন পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন থেকে বঞ্চিত থাকার দাবি করা অনেক কর্মকর্তা এখন প্রশ্ন তুলছেন পরিবর্তনের পরও যদি জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও পেশাগত রেকর্ডের স্বচ্ছ মূল্যায়ন নিশ্চিত না হয়, তাহলে বঞ্চনার অবসান কোথায়?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর এবং ভবিষ্যৎ পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তা। পরিদর্শক থেকে ডিআইজি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে এর ফলে পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে আগের সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং একই সময়ে পদোন্নতি ও ভালো পদায়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার দাবি করা কর্মকর্তাদের উদ্বেগ ভিন্ন ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় তা মিলে যাচ্ছে—পুলিশের ক্যারিয়ার ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট, পূর্বানুমানযোগ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতি প্রয়োজন।
বদলি যখন স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছাড়িয়ে উদ্বেগের কারণ
পুলিশের মতো অপারেশনাল বাহিনীতে বদলি স্বাভাবিক। কিন্তু একজন কর্মকর্তা নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বদলি হলে স্থানীয় অপরাধের প্রকৃতি বোঝা, সোর্স ও তথ্যের নেটওয়ার্ক তৈরি, জনগণ ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ফেনীর পুলিশ সুপারকে নিয়োগের পরপরই সরিয়ে দেওয়া এবং পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই বদলির ঘটনা কর্মকর্তাদের আলোচনায় এসেছে। অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদেরও অভিমত, গ্রাম, জেলা ও মহানগরের মতো ভিন্ন কর্মপরিবেশে বারবার বদলি একজন কর্মকর্তার পেশাগত অভিযোজন ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অবশ্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে ব্যাপক বদলি একটি পর্যায় পর্যন্ত স্বাভাবিক—এমন মতও রয়েছে। সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে গেলে কিছু সমস্যা হবেই। তবে নির্দোষ কর্মকর্তারা যাতে সেই পরিবর্তনের অন্যায্য শিকার না হন, সেদিকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বাধ্যতামূলক অবসর: জবাবদিহি নাকি নতুন অনিশ্চয়তা?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের নাম এসেছে। ১৪১ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে; ১৪২ জনকে ওএসডি করা অথবা অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে এবং পলায়নের অভিযোগে ৯৩ জন সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। বর্তমান সরকারের প্রথম পাঁচ মাসেই অন্তত ৬৭ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের বক্তব্য পরিষ্কার—দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি বলপ্রয়োগ কিংবা ফৌজদারি অপরাধে ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সময়ে চাকরি করা, কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা কিংবা শুধু একটি পদায়নের ইতিহাস যেন ব্যক্তিগত অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হয়ে না দাঁড়ায়।
কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হওয়া উচিত তার ব্যক্তিগত দায়, পেশাগত আচরণ এবং প্রমাণিত কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে—অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম অবশ্য অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে তথ্য পাওয়া গেলেই যাচাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— বঞ্চিতরা কি আবারও বঞ্চিত?
পুলিশের ভেতরের অসন্তোষের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গাটি সম্ভবত এখানেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মেধা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা থাকার পরও রাজনৈতিক পরিচয় বা ভিন্নমতের অভিযোগে বহু কর্মকর্তা পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
১৪ জুন ২০২৬ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনামই ছিল—‘বঞ্চিতরা থেকে যাচ্ছেন বঞ্চিতই’। সেখানে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি-বঞ্চনা, কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন এবং ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।
এই প্রশ্ন অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি নিয়েও জ্যেষ্ঠতা ও গ্রেডেশন অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল। প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, একটি পদোন্নতির তালিকায় গ্রেডেশন নম্বর ৩১-এর একজন কর্মকর্তা স্থান পেলেও তার আগে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বাদ পড়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে, গ্রেডেশন বা জ্যেষ্ঠতা একাই পদোন্নতির স্বয়ংক্রিয় অধিকার তৈরি করে না; পেশাগত রেকর্ড, শূন্য পদ, নির্বাচন বোর্ডের মূল্যায়ন এবং প্রযোজ্য বিধিবিধানও বিবেচ্য। তাই কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়া মানেই অন্যায় হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও মূল্যায়নের কারণও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
১৫তম ও ১৭তম বিসিএস ঘিরে নতুন আলোচনা
সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতিও বাহিনীর ভেতরে জ্যেষ্ঠতা ও ব্যাচভিত্তিক ভারসাম্যের প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে।
৪ জুন ২০২৬ পাঁচ ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দুজন ১৫তম এবং তিনজন ১৭তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা। একই দিনে দুই অতিরিক্ত আইজিপিকে গ্রেড-১ দেওয়া হয়; তাঁদের একজন ১২তম এবং অন্যজন ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা।
এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে— আগের ব্যাচের কোনো যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যদি এখনো পদোন্নতিবঞ্চিত থাকেন, তাহলে জুনিয়র ব্যাচকে বিবেচনার আগে তাঁদের বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে?
এ প্রশ্নের উত্তর অনুমান বা রাজনৈতিক অভিযোগ দিয়ে নয়, প্রকাশযোগ্য ও যাচাইযোগ্য প্রশাসনিক মানদণ্ডের মাধ্যমে দেওয়া দরকার। পদোন্নতির ক্ষেত্রে কে কোন রাজনৈতিক সরকারের সময় কোথায় চাকরি করেছেন—এটি প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠলে পুলিশ আবার পুরোনো চক্রেই ফিরে যাবে। আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ যেমন পুলিশের পেশাদারিত্ব ও ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, নতুন ব্যবস্থায় বিপরীত রাজনৈতিক বিবেচনা প্রতিষ্ঠিত হলেও ফল ভিন্ন হবে না।
১৪০ অতিরিক্ত ডিআইজির শতাধিক এখনো অপেক্ষায়
পদোন্নতির পাশাপাশি নিয়মিত পদায়নের সংকটও রয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ১৪০ পুলিশ সুপারকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। নিয়মিত পদ শূন্য না থাকায় তাঁদের অতিরিক্ত বা সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে মাত্র ২৯ জন নিয়মিত পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। অর্থাৎ শতাধিক কর্মকর্তা এখনো নিয়মিত পদায়নের অপেক্ষায়।
একজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েও যদি দীর্ঘ সময় সংশ্লিষ্ট পদমর্যাদার দায়িত্ব দেওয়া না হয়, তাহলে পদোন্নতির পেশাগত তাৎপর্য অনেকটাই কমে যায়। একই সঙ্গে নিচের ব্যাচের কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার অগ্রগতিতেও জট সৃষ্টি হতে পারে।
সেনাবাহিনীতে বঞ্চনা পর্যালোচনা হলে পুলিশে নয় কেন?
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি তুলনামূলক প্রশ্ন সামনে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বঞ্চনা ও অবিচারের শিকার হওয়ার অভিযোগ পর্যালোচনা করে সশস্ত্র বাহিনীর ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত বা চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তাহলে পুলিশের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ Career Review Board প্রয়োজন নয়? ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়কালে যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতি, পদায়ন কিংবা পেশাগত সুযোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করছেন, তাঁদের প্রত্যেকের রেকর্ড পৃথকভাবে যাচাই করা যেতে পারে। একইভাবে যারা ওই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, তাঁদেরও শুধু পদায়নের কারণে দায়ী না করে ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড ও রেকর্ড যাচাই করা উচিত।
রাজনৈতিক তদবির নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান মানদণ্ড
পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর ধারণা হবে—যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ বেশি কার্যকর। এক সরকার চলে যাওয়ার পর আরেক সরকারের সময় যদি শুধু সুবিধাভোগীর পরিচয় বদলায়, তাহলে সেটি পুলিশ সংস্কার নয়; সেটি একই ব্যবস্থার নতুন সংস্করণ।
পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা, মেধা, সততা, পেশাগত দক্ষতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা, শৃঙ্খলা, এসিআর/এপিএআর, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং প্রশিক্ষণ—এসবের একটি স্বচ্ছ মূল্যায়ন কাঠামো থাকা দরকার। কোনো কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়া হলে বিধিসম্মত সীমার মধ্যে তার কারণ জানানো এবং পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকাও প্রয়োজন।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও সতর্ক করেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে পুলিশের পেশাগত সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা দুর্বল হলে জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীন ও পেশাদার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশ ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন হবে। তাই প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনকে শুধু পরামর্শমূলক প্রতিষ্ঠান করলে হবে না। বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও পেশাগত অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের একটি কার্যকর ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতিতে কেন একজন কর্মকর্তা নির্বাচিত হলেন এবং অন্যজন হলেন না— তার জন্য একটি সুস্পষ্ট মূল্যায়ন কাঠামো থাকা দরকার।
অভিজ্ঞতা হারালে ক্ষতি রাষ্ট্রেরই
পুলিশের একজন দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করতে রাষ্ট্রকে কয়েক দশক সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। মাঠপর্যায়ের পুলিশিং, অপরাধ তদন্ত, গোয়েন্দা কার্যক্রম, সন্ত্রাস দমন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রাতারাতি তৈরি হয় না।
অতএব অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি যাচাই ছাড়া একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে প্রশাসনিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়াও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশের সামনে এখন তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—অতীতের দায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বঞ্চনার সংস্কৃতি তৈরি হতে না দেওয়া।
সংস্কারের পরীক্ষা এখানেই
পুলিশ সংস্কারের সাফল্য শুধু নতুন পোশাক, নতুন গাড়ি, প্রযুক্তি বা সাংগঠনিক কাঠামো দিয়ে বিচার করা যাবে না। প্রকৃত পরীক্ষা হবে একজন কর্মকর্তা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে কতটা ন্যায়সংগত ক্যারিয়ার পাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যাঁরা সত্যিকার অর্থে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের বঞ্চনার ন্যায়সংগত পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আগের সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেই কোনো নির্দোষ কর্মকর্তাকে প্রতিহিংসার শিকার করা যাবে না।
আর বর্তমান সময়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও যদি জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে তদবির, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় প্রভাব বিস্তার করে—এমন ধারণা বাহিনীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে পুলিশের মনোবলের।
একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার ভাষায়, এখন সবচেয়ে জরুরি পুলিশের ভেতরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। কারণ বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চিত থাকলে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কঠিন দায়িত্বে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশ্নটি তাই শুধু কার পদোন্নতি হলো আর কার হলো না—সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি পুলিশ প্রশাসন গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে সরকার পরিবর্তন হবে, কিন্তু কর্মকর্তার পেশাগত ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মানদণ্ড পরিবর্তন হবে না?
সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ পুলিশ অতীতের রাজনৈতিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সত্যিকার অর্থে একটি পেশাদার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হতে পারল কি না।

আপনার মতামত লিখুন :