আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জ থেকে প্রায় ১৯ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগের অভিযোগ নতুন করে তদন্ত করছে সরকার। এসব নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা, পরীক্ষার নম্বরে কারসাজি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ওই সময়ে প্রায় ১৫ হাজার কনস্টেবল, এসআই ও এএসআই এবং ৩ হাজার ৭০০ ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রায় ৩০০ সহকারী পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিয়োগ বা পদোন্নতির বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন।
জেলা কোটার সুযোগ নিতে অনেক চাকরিপ্রার্থী নিয়োগের আগে ওই পাঁচ জেলায় জমি কিনে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কারও ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলেও তদন্তে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পরিবর্তন, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রাজনৈতিক সুপারিশের মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগও যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগে জেলা কোটার কারণে নির্দিষ্ট জেলার প্রার্থীরা বাড়তি সুযোগ পান। অভিযোগ রয়েছে, এই ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে অন্য জেলার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের ওই পাঁচ জেলার বাসিন্দা দেখিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের কয়েক মাস বা এক বছর আগে জমি কেনা কিংবা ঠিকানা পরিবর্তনের ঘটনাও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তদন্তে নিয়োগ পাওয়া সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং তাদের পরিবারের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে দুটি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করে মাঠ পর্যায়ে তথ্য যাচাই করছেন কমিটির সদস্যরা। প্রতিবেদন রেঞ্জ অফিস হয়ে পুলিশ সদর দপ্তর এবং পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এআইজি (জনসংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া) শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘অনিয়ম, জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে কেউ অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়ে থাকলে বিষয়টি যাচাই করে প্রমাণসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সাবেক আইজিপি খোদা বকশ চৌধুরী বলেন, ‘নিয়ম ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার কেউ যদি মনে করে তার বিরুদ্ধে বাহিনীতে অবিচার করা হয়েছে, তাহলে ওই সদস্য আদালতে যেতে পারেন।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকা এবং মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন দমনে অভিযুক্ত সদস্যদের নিয়োগের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ওই পাঁচ জেলা থেকে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে কারা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, হারুন-অর-রশীদ, আছাদুজ্জামান মিয়া ও বেনজীর আহমেদসহ আওয়ামী লীগ আমলে প্রভাবশালী কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িও এসব জেলার মধ্যে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশে ওই অঞ্চলগুলোর একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি হয়েছিল কি না, তদন্তে সেটিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তদন্ত শেষে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন :