যুব উন্নয়নে ২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের ফাইল গায়েবের চুক্তি ২৫ কোটি টাকায়!

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

যুব উন্নয়নে ২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের ফাইল গায়েবের চুক্তি ২৫ কোটি টাকায়!

ফাইল ফটো

মোঃ মতিউর রহমান খান, ময়মনসিংহ থেকে: ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকার প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইল খুঁজে না পাওয়া, নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

এ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমসহ চার কর্মকর্তার নথিপত্র তলব করা হয়েছে।

দুদকের পাশাপাশি ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন এবং ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি চেয়েছে কমিশন।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো দুদকের একটি চিঠি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে চাহিদাকৃত নথিপত্র আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

চার কর্মকর্তার নথি তলব: 

দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. জাহিদ কালাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি প্রকল্প-সংক্রান্ত তদন্তের নথি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকমূলে বদলি সংক্রান্ত সত্যায়িত ছায়ালিপি চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সারাদেশের ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব প্রদান, তা বাতিল ও নতুন পদে পদায়ন সংক্রান্ত নথি এবং ঢাকা, বগুড়া, বরিশাল, পাবনা, ধামরাই, নরসিংদী ও ময়মনসিংহে কর্মরত কয়েকজন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথিও চেয়েছে দুদক।

দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় থাকা চার কর্মকর্তা হলেন—সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করা হয়েছে।

২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের ফাইল কোথায়?

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি প্রকল্পটি ২০২১ সালে শেষ হয়। প্রকল্পটির আর্থিক পরিমাণ ছিল ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকা।

প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম ও গুরুত্বপূর্ণ নথি খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগে ২০২৩ সালে ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা করা হয়। মামলায় ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক ডিডি ফারজানা পারভিন, শেরপুরের ডিডি নুরুজ্জামান চৌধুরীসহ ৭ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।

মামলা নম্বর—০১/২০২৩।

মামলাটি তদন্তের জন্য দুদক ময়মনসিংহ কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত চললেও প্রকল্প-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মামলার বাদী মো. খায়রুল আলম রফিকের দাবি, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ফাইল এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তবে ফাইল গায়েব, নথিপত্র সরিয়ে ফেলা কিংবা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুদকের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা হয়নি। 

এদিকে নথিপত্র ও তদন্ত-সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তদন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে ফেলার পেছনে প্রভাবশালী একটি মহল সক্রিয় ছিল। একটি সূত্রের দাবি, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রভাব ও নির্দেশনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় কাজ করেছে। 

অভিযোগে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, ময়মনসিংহের সাবেক উপপরিচালক (ডিডি) ফারজানা পারভিন, নুরুজ্জামান চৌধুরীসহ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র গায়েব করার জন্য সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গে ২৫ কোটি টাকার একটি চুক্তি হয়েছিল বলে একটি গোপন সূত্র দাবি করেছে।

এ বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় থাকা অভিযোগে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করে নতুন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে ৭৬ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার কথা বলে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।

আসিফ মাহমুদের বক্তব্য কী?

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের পদায়ন বা পদোন্নতিতে মন্ত্রীর অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না; সচিবের মাধ্যমেই এসব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

তিনি আরও বলেন, পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মেধাতালিকা প্রস্তুতের দায়িত্ব সচিবের। এ ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।

আসিফ মাহমুদ বলেন, বাস্তবতা উদ্ঘাটনের স্বার্থে যেকোনো তথ্য-উপাত্ত বা নথি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করতে তিনি প্রস্তুত।

এখন নজর দুদকের তদন্তে: 

২৯২ কোটি টাকার প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইলের অবস্থান, নিয়োগ-পদোন্নতি-বদলি সংক্রান্ত অভিযোগ এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

দুদকের চিঠিতে বিপুলসংখ্যক নথি চাওয়ার ঘটনায় অনুসন্ধানটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন এসব নথি পর্যালোচনার পর অভিযোগগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা, আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে কী তথ্য বেরিয়ে আসে—সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

Link copied!