৫৪৫ স্পটে মাদকের রাজত্ব, ময়মনসিংহে প্রতিদিন ৩ কোটি টাকার কারবার

নিউজ ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৩৮ এএম

৫৪৫ স্পটে মাদকের রাজত্ব, ময়মনসিংহে প্রতিদিন ৩ কোটি টাকার কারবার

ফাইল ফটো

আতিকা ইসলাম, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে :  ‘ভাই, আমার কাছেও আম (ফেনসিডিল) আছে। লাগলে রিং (ফোন) দিয়েন।’—পুরোহিতপাড়া এলাকায় এক উঠতি কিশোরের এমন খোলামেলা প্রস্তাবে বিব্রত হয়ে পড়েন পরিচিত এক তরুণ। কথাটি না শোনার ভান করে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান তিনি। ৯ সেপ্টেম্বর রাতে ময়মনসিংহ শহরের পুরোহিতপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

এর দুদিন আগে একই এলাকার একটি বাড়িতে আকস্মিক অভিযান চালায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে হেরোইন সেবনরত কয়েকজন তরুণ পালিয়ে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ চলে যাওয়ার পরপরই ওই এলাকায় আবারও প্রকাশ্যে হেরোইন সেবন শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পুরোহিত পাড়ায় প্রতিদিন প্রায় ৪৪ স্থানে প্রায় এক কোটি টাকার বিক্রি হয়। সারা নগরীতে প্রায় তিন কোটি টাকার মাদক কারবার হয়। 

এমন চিত্রই যেন শিক্ষানগরী ময়মনসিংহে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের বাস্তবতা তুলে ধরছে। শহর থেকে শুরু করে ত্রিশাল, মুক্তাগাজা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। 

স্থানীয় সূত্র ও মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহর ও শহরতলিতে অন্তত ৫৪৫টি স্থান মাদক কেনাবেচা ও সেবনের স্পট হিসেবে চিহ্নিত। এসব স্পটে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশকে তথ্য দিলে টাকা খেয়ে নাম বলে দেওয়া হয়। এর ভয়ে কেউ মুখ খুলে না। কেউ খুললেও পুলিশ উল্লা তাদের হয়রানি করে।

মাদক ব্যবসায় আশঙ্কাজনকভাবে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তাদের মাদক বহন ও সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে । দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিশোর পরবর্তী সময়ে নিজেরাই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ছোটখাটো মাদক কারবারিরা মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হলেও বড় কারবারিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালানোর আগেই কোনো কোনো কারবারির কাছে খবর পৌঁছে যায়।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মাদক ব্যবসায়ীদের হয়ে কাজ করা কিছু ‘ডেলি মজুরির’ লোকজন থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ের আশপাশে অবস্থান করেন এবং অভিযানের খবর সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক কারবারি দাবি করেন, তিনি একাই ৫৫টি মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ করেন। তার ভাষ্য, এসব স্পট থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ দেওয়া হয় এবং তার মতো আরও অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন। 

৫৪৫ স্পটে মাদকের বিস্তার 

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ নগরীর পুরোহিতপাড়া, কৃষ্টপুর, কেওয়াটখালী, চামড়া গুদাম, রামকৃষ্ণ মিশন রোড, চরপাড়া, মাসকান্দা, সানকিপাড়া, রেল ক্রসিং, সেনবাড়ি, সানকিপাড়া শেষ মোড়, গোহাইলকান্দি মীরবাড়ি, মালগুদাম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) শেষ মোড়, চরকালিবাড়ি, পাটগুদাম ব্রিজ মোড়, কাঁচারিঘাট, টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড, শম্ভুগঞ্জ মধ্য ও পশ্চিম বাজার, সাহেবকাচারী ও খাগডহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। এ তালিকার বাইরে আরও বহু স্পট রয়েছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

সীমান্তপথে আসছে মাদকের চালান  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী জানান, ময়মনসিংহের বিভিন্ন রুটে নিয়মিত মাদকের চালান প্রবেশ করছে। তাদের দাবি, নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে ভারতীয় মাদক বাংলাদেশে ঢুকছে। পরে ট্রাক, বাসসহ বিভিন্ন পরিবহনে এসব মাদক ময়মনসিংহ শহর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

কয়েকজনের দাবি, চোরাচালানের কিছু চালানে চিনির বস্তাসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়াল ব্যবহার করা হয়। এ বিষয়ে একটি ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন। তবে ভিডিওটির সত্যতা ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সঙ্গে শারমিন সুলতানা, তপন, আজিজুল, ইকবাল হোসেন ও সোহেল নামের কয়েকজন জড়িত। তারা ময়মনসিংহের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে  নিয়মিত যাতায়াত করেন।

পুরোনো কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে স্পট 

সূত্র মতে, ময়মনসিংহের বিভিন্ন মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ করছেন শতাধিক পুরোনো ব্যবসায়ী। তাদের অনেকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ,  মাদক কারবারি ও তাদের শিষ্যরা কেউ কেউ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরছেন। দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এসব ব্যক্তির অনেকে নিজ নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন। তাদের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে কিশোর ও তরুণরা।

নগরীর সেনবাড়ি ও সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও পুনরায় মাদক ব্যবসা চালানোর অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। মাদক বিক্রির জন্য তার বেতনভুক্ত কর্মী রয়েছে বলেও দাবি তাদের।

ত্রিশালের কয়েকজন ব্যবসায়ী নিয়েও অভিযোগ

ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে ত্রিশালের ১১ জনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, গত এক দশকে তাদের কেউ কেউ একাধিক বাড়ি ও বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করলে এক পুলিশ কর্মকর্তার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের এক নাগরিক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে ওই কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ত্রিশালের আওয়ামী লীগ নেতা আতিকুর রহমান বলেন, “ত্রিশালে মাদকের ভয়াবহতা সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”

বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা

মাদকের ভয়াবহ ছোবলে ময়মনসিংহে প্রতিদিনই নতুন করে তরুণ-তরুণী ও কিশোররা আক্রান্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মাদকাসক্তের সঠিক সংখ্যা নিয়ে বর্তমানে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

তবে ২০১১ সালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দীপ মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালিত এক জরিপে ময়মনসিংহ নগরীর ২১টি ওয়ার্ডে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মাদকাসক্ত থাকার তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন কিশোর, প্রায় আড়াই হাজার যুবক এবং বাকিরা বিভিন্ন বয়সী ছিলেন বলে ওই জরিপে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে মাদকাসক্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বর্তমানে ময়মনসিংহে মাদকাসক্তের সংখ্যা কত—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

প্রয়োজন কঠোর অভিযান

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু চুনোপুটি নয়, মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। একই সঙ্গে সীমান্তপথে মাদকের প্রবেশ বন্ধ, কিশোরদের ব্যবহার বন্ধ এবং মাদক স্পটগুলোতে নিয়মিত অভিযান জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ময়মনসিংহে মাদকের বিস্তার নিয়ে বক্তব্য জানতে কয়েকদিন আগে পুলিশ সুপার মো. মাসুম আহমেদ ভূঁইয়ার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ মিনিট অপেক্ষার পর তাঁর দপ্তর থেকে জানানো হয় তিনি ব্যস্ত আছেন এবং ওই দিন দেখা করা সম্ভব হবে না। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়।

সিয়াম সরিষা
Link copied!