দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নেতৃত্বের সংকট: নৈতিক অবক্ষয় থেকে পুনর্জাগরণের রূপরেখা : ড.মোঃ আশরাফুর রহমান

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান , লেখক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৩৪ এএম

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নেতৃত্বের সংকট: নৈতিক অবক্ষয় থেকে পুনর্জাগরণের রূপরেখা : ড.মোঃ আশরাফুর রহমান

ফাইল ফটো

রাজনীতি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা বা ব্যালটের অংক মেলানোর প্রকৌশল নয়; এটি মূলত সমষ্টিগত মানবকল্যাণ, ইনসাফ কায়েম ও সমাজ রূপান্তরের একটি সুমহান ব্রত। প্রত্যাশা হলো ইতিহাসের ট্র্যাজেডিগুলো পর্যালোচনা করে সমসাময়িক নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর রাজনৈতিক পথ নির্ধারণ করবে। কারণ নেতা ও নেতৃত্ব তৈরি করতে একটি রাষ্ট্রের বেশ অনেক বাস্তব পরিক্রমা পার হতে হয়।

রাজনীতির আত্মা ও চরিত্রের অনিবার্যতা:

একটি সুরম্য অট্টালিকা যতই দৃষ্টিসুখকর হোক না কেন, তার ভিত্তিপ্রস্তর যদি বালুর ওপর স্থাপিত হয়, তবে সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেই তা ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। রাজনীতিও ঠিক তেমনই। রাজনৈতিক মতাদর্শ, সুসংগঠিত দলীয় ক্যাডার বা বাগ্মিতাপূর্ণ ভাষণ হলো সেই প্রাসাদের বহিরাবরণ; আর নেতার ব্যক্তিগত সততা, ন্যায়বোধ ও চারিত্রিক দৃঢ়তা হলো তার অন্তর্নিহিত ভিত্তি।

প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ কৌটিল্য (চাণক্য) তাঁর অর্থশাস্ত্র-এ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করেছিলেন—শাসকের সর্বপ্রথম কর্তব্য হলো আত্মসংযম ও ইন্দ্রিয়জয়। যে নেতা নিজের লোভ, অহমিকা ও চাটুকার পরিবেষ্টিত মোহকে পরাস্ত করতে পারেন না, তিনি একসময় অনিবার্য ধ্বংসের মুখোমুখি হন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নৈতিকতাকে দুর্বলতা এবং নীতিহীন ধূর্ততাকে 'রাজনৈতিক কূটকৌশল' হিসেবে মহিমান্বিত করার এক সর্বনাশা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এই নীতিহীন চাতুর্য সাময়িক ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ডেকে আনে চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়।

নেতৃত্বের চারিত্রিক মেরুদণ্ড: চারটি মৌলিক ভিত্তি

রাজনীতিতে 'চারিত্রিক মেরুদণ্ড' কোনো কাল্পনিক দার্শনিক তত্ত্ব নয়; এটি নেতার এমন এক মানসিক প্রতিরোধ ক্ষমতা, যা প্রলোভন ও ভীতির মুখেও সত্য থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না। এর প্রধান চারটি স্তম্ভ:

আদর্শিক সততা: ক্ষমতার মোহে বা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য নিজ অঙ্গীকার ও মৌলিক রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে আপস না করা।

আর্থিক স্বচ্ছতা: রাষ্ট্রের রাজকোষকে জনগণের পবিত্র আমানত বিবেচনা করা এবং ক্ষমতার ছায়ায় আত্মীয়-স্বজন বা সিন্ডিকেটের অঢেল বিত্তবৈভব অর্জনের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করা।

জবাবদিহিতার সাহস: নিজের ভুল অকপটে স্বীকার করার মানসিকতা এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান (বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্থা)-কে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা।

জনস্বার্থের অগ্রাধিকার: নিজের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনার চেয়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্থায়িত্ব এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।

নেতৃত্ব যখন এই চারটি ভিত্তির ওপর অবস্থান করে, তখন তা সাধারণ রাজনীতিকের গণ্ডি পেরিয়ে এক যুগান্তকারী রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরিত হয়।

উপমহাদেশীয় রাজনীতির ট্র্যাজেডি: সুনির্দিষ্ট কেস স্টাডি ও বাস্তব পাঠ

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একসময় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও ত্যাগের মহিমা নিয়ে ক্ষমতায় আসা অসংখ্য নেতা পরবর্তীকালে চারিত্রিক স্খলন, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিষাক্ত ছোবলে কীভাবে ইতিহাসের করুণ খলনায়কে পরিণত হয়েছেন।

শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে পরিবার: পরিবারতন্ত্র ও আত্মবিনাশী অহমিকা (২০০৫–২০২২)

শ্রীলঙ্কার আধুনিক ইতিহাস হলো পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির সবচেয়ে প্রামাণ্য ট্র্যাজেডি। ২০০৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসে যখন ক্ষমতায় আসেন এবং ২০০৯ সালে এলটিটিই (তামিল টাইগার) বিদ্রোহীদের দমন করে প্রায় তিন দশকের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটান, তখন সিংহলি জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি বীরের মর্যাদা পান। কিন্তু এই অভাবিত জনপ্রিয়তাই তাঁদের ভেতর সর্বগ্রাসী ক্ষমতার অহংকার জন্ম দেয়।

• ক্ষমতার পারিবারিকীকরণ: মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রধানমন্ত্রী, গোতাবায়া রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট, বাসিল রাজাপাকসে অর্থমন্ত্রী এবং চামাল রাজাপাকসে সেচ ও বিমান পরিবহন মন্ত্রীর পদ দখল করেন। একটি সরকারের রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

• শ্বেতহস্তী প্রকল্প ও দুর্নীতি: হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর ও মাত্তালা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো অলাভজনক, অতি-ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প চীনের ঋণে তৈরি করা হয়, যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল তুঙ্গে। পরবর্তীতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের কাছে লিজ দিতে হয়।

• পতন (২০২২): ২০২১-২২ সালে অর্গানিক চাষের অবৈজ্ঞানিক চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত এবং দেউলিয়াত্বের মুখে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি যখন পুরোপুরি ধসে পড়ে, তখন গড়ে ওঠে 'আরাগলায়া' (Aragalaya) গণবিক্ষোভ। ২০২২ সালের মে মাসে মাহিন্দা রাজাপাকসেকে নৌঘাঁটিতে আশ্রয় নিতে হয় এবং জুলাই মাসে গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে সিঙ্গাপুর গিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ক্ষুব্ধ জনতা রাজাপাকসেদের সুরক্ষিত প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে ঢুকে সাঁতার কাটে ও খাবার খায়—যা ছিল পরিবারতান্ত্রিক অহংকারের ওপর ইতিহাসের চরম চপেটাঘাত।

ভারতে জরুরি অবস্থা ও বোফর্স কেলেঙ্কারি: বিচারহীনতা ও দুর্নীতির প্রতিঘাত

স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতেও নৈতিক স্খলনের স্পষ্ট নজির রয়েছে।

• ইন্দিরা গান্ধী ও জরুরি অবস্থা (১৯৭৫–১৯৭৭): ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিজয়ী ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের সবচেয়ে পরাক্রমশালী নেত্রী। কিন্তু ১৯৭৫ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট যখন রায়বেরেলি আসনে নির্বাচনী অনিয়মের দায়ে তাঁর সাংসদ পদ বাতিল করে, তখন তিনি নৈতিকভাবে পদত্যাগ না করে সারা দেশে জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি করেন। মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়, জয়প্রকাশ নারায়ণসহ বিরোধী নেতাদের জেলে ভরা হয় এবং বিচার বিভাগকে দলীয়করণের চেষ্টা করা হয়। ফলাফল—১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভারতের জনগণ ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর দল কংগ্রেসকে এমন নজিরবিহীন পরাজয়ের মুখোমুখি করে, যা ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের এক বড় বিজয় ছিল।

• রাজীব গান্ধী ও বোফর্স কেলেঙ্কারি (১৯৮৭): ১৯৮৪ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৪০০-এর বেশি আসন) নিয়ে ক্ষমতায় আসা তরুণ ও স্বপ্নদর্শী রাজীব গান্ধীর 'মিস্টার ক্লিন' ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ হয়ে যায় ১৯৮৭ সালে সুইডিশ অস্ত্র প্রস্তুতকারী কোম্পানি বোফর্স-এর হাউইটজার কামান ক্রয়ে ৬৪ কোটি রুপির ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগে। এই কেলেঙ্কারির কারণে দল ছেড়ে বের হয়ে যান বিশ্বনাথ প্রতাপ (ভিপি) সিং এবং ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস ক্ষমতা হারায়। সততার ভাবমূর্তিতে সামান্য কালিমা লাগলেও রাজনীতিতে টিকে থাকা কতটা অসম্ভব, বোফর্স তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পাকিস্তানে ক্ষমতার অপব্যবহার ও কারাবাসের চক্র

পাকিস্তানের ইতিহাস হলো প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, তোষাখানা দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক আপসের এক অন্তহীন উপাখ্যান।

• বেনজির ভুট্টো ও আসিফ আলি জারদারি (১৯৯০-এর দশক): পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ব্যাপক ত্যাগের প্রতীক হলেও তাঁর স্বামী আসিফ আলি জারদারির বিরুদ্ধে ওঠা ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ (যার কারণে তাঁকে আন্তর্জাতিক মহলে 'মিস্টার টেন পারসেন্ট' বলা হতো) ভুট্টো পরিবারের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে চিরতরে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দুর্নীতির কারণে ১৯৯০ ও ১৯৯৬ সালে দুবারই বেনজির সরকারের পতন ঘটে।

• নওয়াজ শরিফ ও পানামা পেপার্স (২০১৬–২০১৭): তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ২০১৬ সালের পানামা পেপার্স ফাঁসের মাধ্যমে লন্ডনের এভেনফিল্ড ফ্ল্যাটসহ বিপুল বেনামী সম্পদের মালিকানার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ৬২(১)(এফ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী 'সাদিক ও আমিন' (সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত) না থাকার কারণে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষণা করে।

• ইমরান খান ও তোষাখানা বিতর্ক (২০২২–২০২৪): দুর্নীতিমুক্ত 'নয়া পাকিস্তান'-এর স্লোগান নিয়ে ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসা সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খান পরবর্তীতে তোষাখানার রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি ও আর্থিক অসংগতির মামলায় ফেঁসে যান। নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার নেতাদের সামান্য আর্থিক অস্বচ্ছতাও কীভাবে তাঁদের আইনি ও রাজনৈতিক ফাঁদে ফেলে দিতে পারে, ইমরান খানের পরিণতি তার স্পষ্ট প্রমাণ।

বাংলাদেশে মাফিয়াতন্ত্র, অর্থপাচার ও গণঅভ্যুত্থান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটেও দেখা গেছে কীভাবে একচ্ছত্র ক্ষমতা এবং আর্থিক দুর্নীতির বেপরোয়া সিন্ডিকেট দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অর্জনকে চোখের পলকে মুছে দেয়।

• ব্যাংক লুটপাট ও অর্থপাচার: হাজার হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে বেনামী ঋণ ও অর্থপাচারের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

• আইনের শাসনের বিলোপ ও পতন: নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ, নির্বাচনী প্রহসন এবং বিরোধী মতকে গুম-খুনের মাধ্যমে দমন করার আত্মঘাতী কৌশলের পরিণতি কখনোই শুভ হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী সরকারের যে নজিরবিহীন পতন ঘটেছে, তা প্রমাণ করে—জনগণের আত্মমর্যাদাবোধ ও ক্ষোভের বাঁধ যখন ভেঙে যায়, তখন রাষ্ট্রীয় কোনো দমন-পীড়নই স্বৈরাচারী শক্তির পতন রুখতে পারে না।

ঐতিহাসিক পাঠের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

রাজাপাকসে পরিবার (শ্রীলঙ্কা, ২০০৫–২০২২):

◦ প্রাথমিক ভাবমূর্তি: তামিল বিদ্রোহ দমনের জাতীয় বীর হিসেবে সমাদৃত।

◦ চারিত্রিক স্খলন ও অপশাসন: চরম পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অপরিকল্পিত ঋণের ফাঁদে ফেলে ব্যয়বহুল মেগা-প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নজিরবিহীন দুর্নীতি।

◦ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিণতি: জাতীয় অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়া, ক্ষুব্ধ জনতার রাষ্ট্রপতির বাসভবন দখল এবং শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া।

ইন্দিরা গান্ধী (ভারত, ১৯৭৫–১৯৭৭):

◦ প্রাথমিক ভাবমূর্তি: অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দৃঢ়চেতা লৌহমানবী নেত্রী।

◦ চারিত্রিক স্খলন ও অপশাসন: ব্যক্তিগত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দেশজুড়ে অগণতান্ত্রিক জরুরি অবস্থা জারি এবং বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নগ্ন দলীয়করণ।

◦ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিণতি: ১৯৭৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক পরাজয় এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মারাত্মক অবমূল্যায়ন।

নওয়াজ শরিফ (পাকিস্তান, ১৯৯০–২০১৭):

◦ প্রাথমিক ভাবমূর্তি: দূরদর্শী শিল্পপতি ও জনপ্রিয় ডানপন্থী মধ্যপন্থী নেতা।

◦ চারিত্রিক স্খলন ও অপশাসন: ব্যাপক কর ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিদেশে বিপুল বেনামী সম্পদ ও অর্থপাচার (পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি)।

◦ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিণতি: সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক রাজনীতিতে আজীবন অযোগ্য ঘোষিত হওয়া এবং দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ড ভোগ।

আসিফ আলি জারদারি (পাকিস্তান, ১৯৯০-এর দশক):

◦ প্রাথমিক ভাবমূর্তি: গণতন্ত্রকামী ও ত্যাগের রাজনীতির অংশীদার।

◦ চারিত্রিক স্খলন ও অপশাসন: প্রতিটি রাষ্ট্রীয় চুক্তিতে প্রকাশ্য কমিশন বাণিজ্য ('মিস্টার টেন পারসেন্ট' খেতাব লাভ) এবং সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার।

◦ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিণতি: নিজ দলের আদর্শিক ও নৈতিক ভিত্তির চরম বিপর্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদে একাধিকবার কারাবাস।

কর্তৃত্ববাদী শাসন (বাংলাদেশ, সাম্প্রতিক ইতিহাস):

◦ প্রাথমিক ভাবমূর্তি: দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামো ও আধুনিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের রূপকার।

◦ চারিত্রিক স্খলন ও অপশাসন: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক ও আর্থিক খাত লুটপাট, জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং ভিন্নমত দমনে চরম দমনপীড়ন।

◦ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিণতি: ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার আকস্মিক ও অমর্যাদাকর পতন।

পতনের মনস্তাত্ত্বিক অ্যানাটমি: ক্ষমতা যেভাবে চরিত্রকে গ্রাস করে

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো রাজনৈতিক নেতাই শুরুতেই দুর্নীতিগ্রস্ত বা স্বৈরাচারী হন না। এটি ঘটে ধাপে ধাপে, আত্মশুদ্ধির অভাব এবং স্তাবকদের ঘেরাটোপে আটকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।

    ক্ষুদ্র নীতিহীন আপস : ক্ষমতার মসনদ ধরে রাখতে বা স্থানীয় স্তরে আধিপত্য বিস্তারে নীতিহীন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলানো।

    অন্ধ স্তাবকদের বলয় তৈরি: নেতা ধীরে ধীরে এমন সব চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন, যারা নেতার যেকোনো ভুলকে 'যুগান্তকারী দূরদর্শিতা' বলে প্রশংসা করে এবং সত্যভাষীদের দূরে সরিয়ে দেয়।

    বাস্তববিচ্ছিন্নতা: সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ক্ষুধার জ্বালা কিংবা বাজারদরের আগুন আর নেতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাচের প্রাসাদে পৌঁছায় না। নেতা নিজের তৈরি এক কাল্পনিক উন্নয়নের স্বর্গে বাস করতে শুরু করেন।

    অলঙ্ঘনীয়তার ভ্রান্ত বিশ্বাস: নেতা নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চেয়েও বড় এবং অপরিহার্য ভাবতে শুরু করেন। ঠিক তখনই ইতিহাসের অমোঘ বিধানে তাঁর পায়ের তলার মাটি সরে যেতে থাকে।ঘটে যায় অনিবার্য ঐতিহাসিক পতন ।

নেতৃত্বের পুনর্জাগরণে শিক্ষণীয় পথনির্দেশ

উপমহাদেশের এই অন্ধকার অধ্যায়গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে হয়, তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিম্নোক্ত নীতিগুলো কঠোরভাবে ধারণ করতে হবে:

সততাকে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি জ্ঞান করা: অর্থের দাপট, পেশিশক্তি বা প্রশাসনিক কারসাজি দিয়ে ক্ষণিকের জন্য ক্ষমতায় থাকা যায়; কিন্তু জাতীয় দুর্যোগের দিনে কেবল নেতার অটুট সততা ও জনমানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাঁকে সুরক্ষা দেয়। একজন নেতার সবচেয়ে বড় বর্ম হলো তাঁর নৈতিক নিষ্কলুষতা।

তোষামোদকারীদের থেকে দূরত্ব ও সমালোচনা সহ্য করা: রাজনীতিবিদদের জন্য সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদান হলো স্তাবকতা। যে নেতা তাঁর মুখের ওপর অপ্রিয় সত্য বলার মতো সহকর্মী বা বন্ধুদের ধারণ করতে পারেন না, তাঁর পতন নিশ্চিত। গঠনমূলক সমালোচনাকে শত্রুতা নয়, আত্মশুদ্ধির দর্পণ হিসেবে দেখতে হবে।

রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা: রাজনীতি যেন অর্থ উপার্জনের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত না হয়। পরিবার ও দলীয় ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটকে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন থেকে শত যোজন দূরে রাখতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: ক্ষমতাসীন অবস্থায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিচারালয়কে নিজ দলের পক্ষে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হয়, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সেই অস্ত্রটিই নিজের দিকে তাক হতে পারে।

সময়মতো ক্ষমতা হস্তান্তরের ঔদার্য: গণতন্ত্রে কেউ অপরিহার্য নয়। ক্ষমতার লোভ সংবরণ করে একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার মানসিকতাই একজন রাজনেতাকে অমর করে তোলে।

রাজনীতি কোনো অন্ধকার স্বার্থান্বেষী চোরাগলি নয়; এটি আত্মাহুতি ও মানুষের সেবার সর্বোচ্চ পবিত্র মঞ্চ। উপমহাদেশে রাজনীতির যে সংকট আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা মূলত কোনো নীতি বা সম্পদের সংকট নয়—এটি হলো মৌলিক সততা ও চারিত্রিক মেরুদণ্ডের তীব্র সংকট। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, সময়ের মহাস্রোতে রাজা-মহারাজা ও পরাক্রমশালী শাসকেরা এক নিমেষে বিলীন হয়ে গেছেন। কিন্তু ইতিহাস সেই নেতাদেরই মনে রেখেছে, যাঁদের চরিত্র ছিল কলঙ্কহীন এবং মেরুদণ্ড ছিল সত্যের মতো ঋজু।

ভবিষ্যতের মুক্ত, গণতান্ত্রিক ও মর্যাদাপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে আমাদের এমন একদল রাজনীতিক প্রয়োজন, যাঁরা লোভের সামনে নত হবেন না, ভয়ের কাছে বিক্রি হবেন না এবং ক্ষমতার মোহে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। চারিত্রিক নিষ্কলুষতা এবং আপসহীন নৈতিকতাই হোক আগামীর রাজনীতির প্রধান পরিচয়চিহ্ন।

 

(লেখক: অতিরিক্ত আইজিপি অব. ও জন-নিরাপত্তা বিশ্লেষক)

সিয়াম সরিষা
Link copied!