স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি শুরু করেছিলেন আবজাল হোসেন। মাসিক বেতন-ভাতা ছিল প্রায় ৩০ হাজার টাকা। তার স্ত্রী রুবিনা খানমও একই অধিদপ্তরের সাবেক স্টেনোগ্রাফার। অথচ এই দম্পতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন— দুদকের নথি ও তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে।
দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন আবজাল হোসেন। তার বিরুদ্ধে দুদকের তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি মামলার তদন্ত এখনো চলমান। ফলে এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াও পুরোপুরি এগোয়নি।
দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আবজাল ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের নামে-বেনামে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি, প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। তাদের সম্পদের একটি অংশ বিদেশেও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের মোট বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আবজাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাকরি করলেও তার জীবনযাপন ছিল চাকরির আয় ও পদমর্যাদার তুলনায় অনেকটাই ব্যতিক্রমী। নিজস্ব দামি গাড়িতে চলাফেরার পাশাপাশি রাজধানীর উত্তরায় তার ও স্ত্রীর নামে একাধিক বাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কে একটি ভবন ২০১০ সালে রুবিনা খানমের নামে কেনা হয় বলে জানা গেছে। ভবনটির ষষ্ঠ তলায় বসবাস করতেন আবজাল দম্পতি। একই এলাকার ১৬ নম্বর সড়কেও তাদের আরেকটি ভবন রয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৪টি প্লট ও ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
শুধু দেশেই নয়, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও আবজাল দম্পতির সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আবজালের স্ত্রী রুবিনা খানম বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। সেখানে তাদের একটি বাড়ি রয়েছে বলেও জানা গেছে।
অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা
২০১৯ সালের ২৭ জুন জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আবজাল হোসেন ও রুবিনা খানমের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক।
একটি মামলায় প্রায় ২৬৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮১ হাজার ১৭৫ টাকা অবৈধভাবে অর্জন ও পাচারের অভিযোগ আনা হয়। অপর মামলায় প্রায় ২০ কোটি ৭৪ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়।
দুদকের উপপরিচালক মো. সাহিদুর রহমান বলেন, আবজাল হোসেনের বিরুদ্ধে দুদকের তিনটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্য দুটি মামলার তদন্ত চলছে।
স্বাস্থ্য খাতে প্রভাবের অভিযোগ
আবজাল হোসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখায় হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার স্ত্রী রুবিনা খানম ছিলেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার সাবেক স্টেনোগ্রাফার।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, রুবিনা খানম ‘রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
তাদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য খাতে প্রভাব বিস্তার ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
কারাগারে আবজাল
দুদকের মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে আবজাল হোসেন বর্তমানে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি কারাগারে পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। স্বজনরা তার খাবারের জন্য কারাগারের ক্যান্টিনে টাকা জমা দেন বলেও জানা গেছে।
কারাগারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, আবজাল সেলে অন্য বন্দিদের সঙ্গে গল্পগুজব ও দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে সময় কাটান। তবে কারাগারে তার জীবনযাপন সম্পর্কে এসব তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হাইকোর্টে জামিন আবেদন
অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের করা দুই মামলায় জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন আবজাল হোসেনের আইনজীবী। সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট শাখায় আবেদন জমা দেওয়ার পর মামলাগুলোর শুনানির দিন নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দুদকের আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান জানিয়েছেন, মামলাগুলোর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
যেভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাকরি
আবজাল হোসেনের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। ১৯৯২ সালে তৃতীয় বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর আর পড়াশোনা করেননি তিনি।
১৯৯৫ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের সুপারিশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন প্রকল্পে অফিস সহকারী পদে অস্থায়ীভাবে যোগ দেন আবজাল। ২০০০ সালে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হলে তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দেন।
পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। চাকরিজীবনে তার আয় ও সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় আসে।
আবজাল দম্পতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের দোষী হিসেবে গণ্য করা যায় না।

আপনার মতামত লিখুন :