বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে বিয়ে, প্রতারণা, মানসিক হয়রানি, একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ শবনম নামের এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, বিয়ে এবং বিয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই তালাকের নোটিশ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শবনমের দাবি, নাসির উদ্দীনের সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব ২০২২ সালে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। এ সময় তারা বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত, একে অপরের বাসায় যাওয়া এবং পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন বলে জানান তিনি।
বিয়ের প্রতিশ্রুতি থেকে সম্পর্কের জটিলতা: শবনমের অভিযোগ, ২০২৩ সালের শেষদিকে নাসির উদ্দীন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তার ড্রাইভার টুটুলের উপস্থিতিতে বিয়ে এবং রূপপুরে বাসা করে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে সে সময় শবনমের আগের সংসারের বিচ্ছেদ সম্পন্ন না হওয়ায় বিয়ের বিষয়টি এগোয়নি বলে তার বক্তব্য।
শবনমের ভাষ্য, নাসির উদ্দীন তাকে বারবার আগের সংসার ছেড়ে তার কাছে চলে আসতে বলতেন। এমনকি দুই স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করার কথাও বলতেন। বিষয়টি নাসিরের দ্বিতীয় স্ত্রী জানতে পারার পর শবনমের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি তার। শবনমের অভিযোগ, সম্পর্ক শেষ করার চেষ্টা করলেও নাসির উদ্দীন বিভিন্ন সময় তার বাসায় গিয়ে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করতেন এবং যোগাযোগ বন্ধ না করার প্রতিশ্রুতি নিতেন।
প্রথম সংসারের বিচ্ছেদের পর বিয়ের সিদ্ধান্ত: শবনমের দাবি, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি তার প্রথম স্বামীকে তালাক দেন। এরপর মার্চে বিষয়টি নাসির উদ্দীনের দ্বিতীয় স্ত্রী জানতে পারলে পারিবারিক বিরোধ শুরু হয়। এ অবস্থায় শবনম নাসির উদ্দীনকে বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বললে তিনি সময় চান এবং বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দেন বলে অভিযোগ করেন শবনম।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মে ঢাকায় নাসির উদ্দীনের সঙ্গে দেখা হলে একপর্যায়ে একজন মৌলভিকে ডেকে তাদের বিয়ে পড়ানো হয়। ওই সময় নূর মোহাম্মদ নামে একজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে কাবিনের জন্য নাসির উদ্দীন এক সপ্তাহ সময় চান এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে কাবিন সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন বলে শবনম জানান।
এরপর ২৪ মে নাসির উদ্দীন নিজেই ফোন করে ১ জুন কাবিন করার কথা বলে শবনমকে ঢাকায় আসতে বলেন বলে দাবি তার। শবনমের ভাষ্য, ১ জুন সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। এরপর নাসির উদ্দীন তাকে ট্রেনে তুলে দেন এবং বিমানবন্দর পর্যন্ত সঙ্গে যান।
বিয়ের পরই যোগাযোগ বন্ধ: শবনমের দাবি, ১১ জুন তাকে ঢাকায় আসতে বলা হয় এবং ২৫ জুন একসঙ্গে ঘোরার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু ২৯ জুন হঠাৎ করে নাসির উদ্দীন তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
২ জুলাই শবনম ঢাকায় এসে পিটিআই থেকে তাকে ফোন করলে নাসির উদ্দীন নিজেকে নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছেন বলে জানান বলে দাবি করেন তিনি। তবে শবনমের অভিযোগ, প্রকৃতপক্ষে নাসির উদ্দীন আগের দিন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে টাঙ্গাইলে চলে গিয়েছিলেন। শবনমের দাবি, ৩ জুলাই তাদের সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। ওই দিনও নাসির উদ্দীন স্বাভাবিকভাবে তার সঙ্গে কথা বলেন এবং পাবনা যাওয়ার জন্য টিকিট করে দেন।
কিন্তু এর মাত্র দুই দিন পর, ৫ জুলাই, ২ জুলাইয়ের তারিখ উল্লেখ করে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয় বলে দাবি শবনমের। তার অভিযোগ, তালাকের বিষয়ে তিনি আগে কোনো ধরনের নোটিশ বা পূর্বসংকেত পাননি।
তালাকের নোটিশ নিয়ে প্রশ্ন: শবনম আরও দাবি করেন, ৯ জুলাই তিনি রেল ভবনে নাসির উদ্দীনের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও তখনও তালাকের নোটিশ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। নাসির উদ্দীন তাকে দেখেও কোনো কথা না বলে চলে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি। শবনমের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—বিয়ের মাত্র এক মাসের মধ্যে, কোনো দৃশ্যমান বিরোধ বা পূর্বঘোষণা ছাড়াই কীভাবে তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? তাদের দাবি, পুরো ঘটনাটি বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার শামিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথি, বিয়ের কাবিননামা, তালাকের নোটিশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
রেল ভবনে লিখিত অভিযোগ:অভিযোগের পর ২৭ জুলাই শবনম তার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রেল ভবনে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন বলে জানা গেছে। শবনমের দাবি, এর পর নাসির উদ্দীন পাল্টা অভিযোগ করেন—নূর মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে রেল ভবনে প্রবেশ করেছিলেন।
তবে শবনমের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, নূর মোহাম্মদ সেদিন তাদের সঙ্গে রেল ভবনে যাননি। রেল ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে বলেও তারা দাবি করেছেন।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও নানা অভিযোগ: নাসির উদ্দীনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও শবনমের পক্ষ থেকে আরও কিছু অভিযোগ করা হয়েছে। তার দাবি, নাসির উদ্দীন প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ১২ বছর সংসারের পর ২০১৮ সালে বিচ্ছেদ করেন। ওই সময় সাবেক স্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ২০১৯ সালে নাসির উদ্দীন দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং ২০২০ সালে যমজ কন্যাসন্তানের বাবা হন বলে শবনমের দাবি।
এ ছাড়া লালমনিরহাটের শোভা, পার্বতীপুরের জাহানারাসহ আরও কয়েকজন নারীর সঙ্গে নাসির উদ্দীনের সম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন শবনম। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মেসেজ ও স্ক্রিনশট ঘিরে নতুন অভিযোগ: নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ করা হয়েছে।এ বিষয়ে কিছু স্ক্রিনশট ও বার্তার কপি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব বার্তায় নাসির উদ্দীনের সঙ্গে বিভিন্ন নারীর ব্যক্তিগত কথোপকথনের দাবি করা হলেও স্ক্রিনশটের সত্যতা, প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর প্রকৃত মালিকানা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
ফলে এসব ডিজিটাল উপাত্তের ফরেনসিক যাচাই ছাড়া এগুলোকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নাসির উদ্দীনের বক্তব্য জানতে রেল মন্ত্রণালয়ে সরেজমিনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকের কথা শুনে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান । রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৃথক দুটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :