যেকোনো জাতির প্রাণশক্তি তার তরুণ সমাজ। আজকের যে প্রজন্ম শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে, সমাজবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষায় তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে ‘জেন-জি’ (Gen-Z) নামে। বাংলাদেশে এই প্রজন্ম বিপুল সম্ভাবনাময়, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং বৈশ্বিক চিন্তাভাবনায় অগ্রসর। কিন্তু এই অমিত সম্ভাবনার বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা আমাদের সমাজকে গভীরভাবে আহত করছে। তা হলো বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শিষ্টাচারের সংকট, মতের অমিল হলেই অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরম অসহিষ্ণুতার প্রকাশ। যে সংস্কৃতিতে বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন ছিল আত্মিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে এই আচরণিক বিচ্যুতি কেবল প্রজন্মগত ব্যবধান নয়, বরং একটি সুগভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
ঐতিহ্যের শিকড়: আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পটভূমি
বাঙালির ইতিহাস কেবল সংগ্রাম ও বিজয়ের নয়, এটি সৌহার্দ্য ও শ্রদ্ধাবোধের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য। আবহমানকাল ধরে আমাদের সমাজে পারিবারিক কাঠামোটি ছিল পারস্পরিক সম্মান ও স্নেহের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
• পারিবারিক শাসন ও স্নেহ: যৌথ পরিবারের আঙিনায় বড় হওয়া সন্তানরা শৈশব থেকেই শিখেছে কীভাবে ছোটকে স্নেহ করতে হয় এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সামনে বিনম্র থাকতে হয়।
• ভিন্নমতের প্রকাশে সংযম: প্রবীণদের কোনো সিদ্ধান্ত বা আচরণ মনঃপূত না হলেও মুখের ওপর কড়া কথা বলা কিংবা অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহার করা ছিল অকল্পনীয়। মতভেদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও শালীনতা রক্ষা করা ছিল শিক্ষার প্রথম পাঠ।
• সামাজিক অভিভাবকত্ব: পাড়া-মহল্লায় বয়োবৃদ্ধ যেকোনো ব্যক্তি কেবল নিজের পরিবারের অভিভাবক ছিলেন না, গোটা সমাজের অভিভাবক হিসেবে গণ্য হতেন। তাঁর সামনে অশালীন আচরণ তো দূর, উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেও তরুণরা দ্বিধা করত।
এই শিক্ষা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সিলেবাসের অংশ ছিল না; বরং তা ছিল প্রাত্যহিক জীবনের অলিখিত সামাজিক চুক্তি। সময়ের আবর্তে সেই দৃঢ় সামাজিক ভিত্তি আজ ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে পড়ছে।
সমকালীন বাস্তবতা: অনলাইন আগ্রাসন ও অফলাইন অসহিষ্ণুতা
বর্তমান তরুণ সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের আচরণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, যে কোনো সামাজিক, রাজনৈতিক বা পারিবারিক বিষয়ে তারা খুব দ্রুত অধৈর্য হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই প্রবণতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
• স্ক্রিনের আড়ালের সাহসিকতা: সরাসরি সাক্ষাতে যে কথাটি কেউ বলতে সাহস পায় না, সোশ্যাল মিডিয়ার মন্তব্যের ঘরে সেই কথাটিই অত্যন্ত কদর্য ও অশ্লীল ভাষায় প্রকাশ করা হচ্ছে।
• ট্রোল ও বয়কট সংস্কৃতি: প্রবীণদের কোনো ভুল, অসতর্ক মন্তব্য কিংবা ভিন্নমতের কারণে তাদের লক্ষ্য করে ডিজিটাল মব সৃষ্টি করা হচ্ছে। সেখানে যুক্তির স্থান দখল করছে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিকৃত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ।
• অসম্মানকে ‘স্পষ্টবাদিতা’ ভাবার বিভ্রম: রূঢ় আচরণ ও গালিগালাজকে অনেকে সাহসিকতা বা আপসহীন মনোভাবের সমার্থক ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। অথচ স্পষ্টভাষী হওয়ার অর্থ কখনো অশালীন হওয়া নয়।
এই মানসিকতা তরুণদের ব্যক্তিত্বকে সংকুচিত করছে এবং প্রবীণ প্রজন্মের সঙ্গে তাদের তৈরি করছে এক বিশাল মানসিক দূরত্ব।
সংকটের নেপথ্যে: ব্যবধান বৃদ্ধির প্রধান কারণসমূহ
তরুণদের একতরফা দোষারোপ না করে এই সামাজিক স্খলনের কারণগুলো নির্মোহভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কোনো প্রজন্মই হঠাৎ করে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে না; এর পেছনে সক্রিয় থাকে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর।
পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন ও সংযোগহীনতা একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ক্ষুদ্র পরিবার তৈরি হয়েছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় মা-বাবা সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় গুণগত সময় দিতে পারছেন না। ফলে পরিবারের ভেতরে যে নৈতিক অনুশাসন ও সহমর্মিতার চর্চা হওয়ার কথা ছিল, তা অনেকাংশে অনুপস্থিত। সন্তান ও অভিভাবকদের মধ্যকার নিয়মিত কথোপকথন কমে যাওয়ায় সংবেদনশীলতা লোপ পাচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম ও ভার্চুয়াল বিচ্ছিন্নতা ডিজিটাল দুনিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো যা উগ্রতা, ক্ষোভ ও বিতর্ককে বেশি ছড়িয়ে দেয়। ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার লোভে তরুণরা আরও বেশি আক্রমণাত্মক হচ্ছে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই কৃত্রিম ব্যস্ততা তাদের বাস্তব জীবনের শিষ্টাচার ও অনুভূতির পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার সংকোচন আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় জিপিএ, নম্বর ও প্রতিযোগিতার পেছনে যতটা শ্রম দেওয়া হচ্ছে, সহনশীলতা, মানবিকতা ও আচরণের শুদ্ধতার ওপর ততটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সনদ তৈরির কারখানায় রূপ নেওয়ায় ছাত্র-শিক্ষকের আত্মিক সম্পর্কও ক্রমশ ম্লান হচ্ছে।
সামাজিক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের অভাব সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ভিন্নমত দমনের যে ভাষা ও চর্চা চারদিকে দেখা যায়, তরুণরা তা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছে। বড়দের পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি দেখে তরুণরা অবচেতনভাবেই ধরে নিচ্ছে যে আক্রমণাত্মক ভাষাই ক্ষমতা প্রকাশের স্বাভাবিক মাধ্যম।
সংকট সমাধানের রূপরেখা: বহুমুখী দায়িত্ব ও পদক্ষেপ
এই সামাজিক অবনমন থেকে মুক্তির পথ কোনো একক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে না। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র—প্রতিটি স্তর থেকেই যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী।
সংকট উত্তরণে বহুমুখী দায়বদ্ধতা ও রূপরেখা
১. পরিবার
• মূল করণীয়: সন্তানদের পর্যাপ্ত গুণগত সময় দেওয়া, পারিবারিক পরিসরে নৈতিক মূল্যবোধের নিয়মিত চর্চা করানো এবং তাদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বা ডিজিটাল ব্যস্ততার ওপর সুস্থ নজরদারি রাখা।
• প্রত্যাশিত ফলাফল: সন্তানের মধ্যে মানসিক স্থিতিশীলতা তৈরি হবে এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সহজাত শ্রদ্ধাশীল আচরণের বিকাশ ঘটবে।
২. শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
• মূল করণীয়: কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের ভাষা শিক্ষা, সামাজিক শিষ্টাচার ও সহমর্মিতার পাঠ দেওয়া এবং নিজেদের আচরণ দিয়ে তাদের সামনে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা।
• প্রত্যাশিত ফলাফল: শিক্ষার্থীরা শুধু মেধাবী নয়, বরং যুক্তিনির্ভর, সংবেদনশীল এবং বিনম্র নাগরিক হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করবে।
৩. জেন-জি তরুণ সমাজ
• মূল করণীয়: নিয়মিত আত্মপর্যালোচনা করা, ভিন্নমতকে শান্তভাবে শোনার মানসিক ধৈর্য গড়ে তোলা এবং বাস্তব জীবনের পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগেও ভাষার শালীনতা রক্ষা করা।
• প্রত্যাশিত ফলাফল: তাদের ভেতর ভবিষ্যতের নেতৃত্বের উপযোগী দূরদর্শিতা তৈরি হবে এবং সমাজের সব স্তরে তাদের মানবিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
৪. সমাজ ও রাষ্ট্র
• মূল করণীয়: তরুণদের জন্য সাইবার স্পেসে সুস্থ বিনোদন ও সৃজনশীলতার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক শিষ্টাচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।
• প্রত্যাশিত ফলাফল: সমাজে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে এবং তরুণদের মাঝে অসহিষ্ণুতা কমে একটি উগ্রতামুক্ত, সম্প্রীতিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ গড়ে উঠবে।
পরিবারের প্রাথমিক দায়িত্ব: শিষ্টাচারের প্রথম পাঠশালা
একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার। পিতা-মাতাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সন্তান ভার্চুয়াল জগতের আগ্রাসী ভাষার সংস্পর্শে এসে নিজের শিকড় ভুলে না যায়।
• সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে, তাদের ক্ষোভ বা হতাশা থাকলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।
• বড়দের সামনে কীভাবে কথা বলতে হয়, তা মুখে বলার চেয়ে নিজেরা বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা ও সম্মান করে দেখিয়ে দিতে হবে।
• সন্তান সামাজিক মাধ্যমে কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করছে বা কাদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে—শাসন নয়, বন্ধুত্বের ছলে।
শিক্ষক ও সমাজের ভূমিকা: আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠা
শিক্ষকদের ভূমিকা কেবল পাঠ্যক্রম শেষ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিক্ষক হলেন পথপ্রদর্শক।
• ক্লাসরুমে মতবিনিময়ের সময় ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর শিক্ষা দিতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী ভুল করলে তাকে শালীন ভাষায় শুধরে দেওয়ার সংস্কৃতি চালু রাখতে হবে।
• শিক্ষকরা নিজেদের আচরণ ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, যা দেখে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই শ্রদ্ধাবনত হতে শিখবে।
• পাড়া-মহল্লায় প্রবীণ ও তরুণদের নিয়ে পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে দুই প্রজন্মের মধ্যে প্রত্যক্ষ মেলবন্ধন গড়ে ওঠে।
সহনশীলতা ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব
এই জেন-জি প্রজন্মই আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে। তাদের মেধা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পরিবর্তন আনার সাহস নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মেধার সঙ্গে যদি শিষ্টাচার এবং জ্ঞানের সঙ্গে যদি নম্রতা যুক্ত না হয়, তবে সেই নেতৃত্ব কখনো দীর্ঘস্থায়ী বা কল্যাণকর হতে পারে না।
দেশ পরিচালনা মানে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার চর্চা নয়; এর অর্থ হলো সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও প্রয়োজনকে ধারণ করা। যে তরুণ আজ একজন বয়োবৃদ্ধের কথার সামান্য ত্রুটির কারণে তাকে অপমান করতে পারে, কাল সে রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকের মতবিরোধ সহ্য করার ধৈর্য হারাবে। সহনশীলতা কোনো দুর্বলতা নয়, এটি সবল চরিত্রের শ্রেষ্ঠ ভূষণ। আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শ্রদ্ধাবোধের ভেতর দিয়েই একজন মানুষ প্রকৃত নেতায় পরিণত হয়।
আমাদের অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্য এবং বর্তমানের বৈশ্বিক অগ্রসরতার মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানো আজ সময়ের দাবি। তরুণ প্রজন্ম তাদের দ্রোহ ও আধুনিকতাকে ধারণ করুক, কিন্তু তার ভাষা হোক শালীন, চিন্তা হোক দায়িত্বশীল এবং আচরণ হোক শ্রদ্ধাপূর্ণ। তবেই একটি সমৃদ্ধ, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
(লেখক : অতিরিক্ত আইজিপি অব. ও জন-নিরাপত্তা বিশ্লেষক)

আপনার মতামত লিখুন :