ঢাকার সাভারে দিন দিন বাড়ছে মাদকের বিস্তার। মাদকের সহজলভ্যতায় বিপথগামী হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও তরুণরা। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে।
সাভার উপজেলায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। জনসংখ্যা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন অপরাধী চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাভারের বিভিন্ন এলাকায় শত শত মাদকের স্পট রয়েছে। এসব স্থানে গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি হয়। তবে ইয়াবার বেচাকেনা নিয়েই বেশি অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বিভিন্ন কৌশলে মাদক পরিবহন ও বিক্রি করে থাকে।
মাদককে কেন্দ্র করে সাভারের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ভূমিদখলসহ নানা অপরাধের বিস্তার ঘটছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে অনেকে হামলা-মামলার আশঙ্কায় থাকেন। অভিযানের আগেই খবর পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো কোনো এলাকায় পৌঁছানোর আগেই কারবারিরা খবর পেয়ে যায়। ফলে অভিযানে মূল হোতাদের অনেকেই ধরা পড়ে না। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাভারের বিভিন্ন এলাকার মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বের হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। সাদাপুরে চুন্নু খানের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ
সাভারের সাদাপুর পুরানবাড়ী এলাকায় চুন্নু খান নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বড় ধরনের মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্র এলাকায় ঘুরে ঘুরে মাদক বিক্রি করে।
স্থানীয়দের অভিযোগে ওই চক্রের কয়েকজন সদস্যের নামও উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন দিলা, মোখলেছ খান, হেলাল, উজ্জ্বল, সাহাদাত ও ইব্রাহিমের নাম রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, উজ্জ্বলকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের পর সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দেলোয়ার হোসেন দিলা, মোখলেছ খান ও হেলালকে ঈদের আগে হেরোইনসহ আটক করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন পুলিশের এএসআই আশরাফুল।
সাদাপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদক ব্যবসার কারণে এলাকার তরুণদের একটি অংশ বিপথগামী হচ্ছে। নেশার টাকা সংগ্রহ করতে না পেরে কেউ কেউ চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতেও সাহস পান না বলে তাদের দাবি।
সাভার পৌরসভার মজিদপুর, ছোট বলিমেহের, মিটন, ব্যাংক কলোনি, কাতলাপুর, আনন্দপুর, নামাগেন্ডা, চাঁপাইন, সিআরপি রোড, বনপুকুর, নিমেরটেক, জোরপুল, চাকুলিয়া, বনগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া আমিনবাজার, ঝাউচর, ভাটপাড়া, বেদেপল্লী, জামসিং, রেডিও কলোনি, বিরুলিয়া, ছোট কালিয়াকৈর, ভবানীপুর, হেমায়েতপুর, যাদুরচর, রাজফুলবাড়িয়া ও পানপাড়াসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয়ভাবে একাধিক ব্যক্তির নাম আলোচিত হচ্ছে।
তবে অভিযোগের তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগকে অপরাধ প্রমাণিত হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, মাদকের কিছু স্পট থেকে থানা পুলিশের অসাধু সদস্যদের নিয়মিত মাসোয়ারা দেওয়ার কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সাইফুল আলম এসব অভিযোগের বিষয়ে বলেন, মাদক ব্যবসায়ী যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে মাদকের বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহকারী, খুচরা বিক্রেতা এবং পেছনের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিভাবকদের আশঙ্কা, মাদকের সহজলভ্যতা অব্যাহত থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তরুণ প্রজন্ম। তাই মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাভারকে মাদকের বিস্তার থেকে মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আপনার মতামত লিখুন :