মোহাম্মদ রাশেদ, কক্সবাজার: বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জারদের গ্রেডেশন নিয়ে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এবং অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ (স্টে) বহাল থাকার মধ্যেই গ্রেডেশন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আদালতের আদেশের মাত্র দুই দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চিঠি জারি এবং এর পরপরই খসড়া গ্রেডেশন শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, আদালতের স্থগিতাদেশ বহাল থাকার পরও ডেপুটি রেঞ্জারদের খসড়া গ্রেডেশন শুনানি সম্পন্ন করে তা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিচারাধীন একটি বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় প্রশাসনিক কার্যক্রম এভাবে এগিয়ে নেওয়ার এখতিয়ার ও বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ডেপুটি রেঞ্জারদের গ্রেডেশনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল মামলা নং-১০/২০২৬-এ গত ১১ মার্চ ২০২৬ একটি আদেশ দেওয়া হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট পক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং-১১১০/২০২৬ দায়ের করে।
এর ধারাবাহিকতায় ১০ মে ২০২৬ আপিল বিভাগের জাজ-ইন-চেম্বার একটি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীতে ওই স্থগিতাদেশ বাতিলের (ভ্যাকেট) আবেদন করা হলে আপিল বিভাগ নির্দেশ দেন, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা স্থগিতাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পূর্বের স্টে বহাল থাকবে। একই সঙ্গে আবেদনটি চার সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, আপিল বিভাগের ওই আদেশের মাত্র দুই দিন পর, ১২ মে ২০২৬ বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ৮৬১ নম্বর স্মারকে একটি চিঠি জারি করে। এর পর ১৪ মে ডেপুটি রেঞ্জারদের খসড়া গ্রেডেশন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় ওই চিঠি জারি এবং গ্রেডেশন শুনানি কীভাবে অনুষ্ঠিত হলো। তাদের মতে, এ ধরনের কার্যক্রম আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, ওই শুনানিতে সিএফ হোসাইন নিশাত, সিএফ (অ্যাডমিন) আর. এস. মনিরুল ইসলাম, ডিসিএফ উম্মে হাবিবা, ডিসিএফ রোকসানা, ডিসিএফ হুমায়ুন কবির এবং অফিস সহকারী কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
তাদের পক্ষ থেকে আরও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে গ্রেডেশন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে স্থগিতাদেশ বাতিলের সুযোগ নিয়ে প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ এ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
এদিকে ডেপুটি রেঞ্জারদের গ্রেডেশন নিয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১, ঢাকায় মামলা নং-৩৪৭/২০২৫, ২৯৪/২০২৫, ৩৭৬/২০২৫, ৩৮৬/২০২৫, ১০/২০২৬ ও ১৯৩/২০২৬ বিচারাধীন রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-৩-এ মামলা নং-২১২/২০২৬ এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং-১১১০/২০২৬ বিচারাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
একই বিষয়ে একাধিক মামলা বিচারাধীন থাকার মধ্যেই প্রশাসনিক পর্যায়ে গ্রেডেশন চূড়ান্ত করার উদ্যোগের অভিযোগ ওঠায় বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীরা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-৩-এর মামলা নং-২১২/২০২৬-এর প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, ২৯ জুলাই ২০২৬ মামলাটিতে নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারির পরও, অভিযোগ অনুযায়ী, আদেশের অনুলিপি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই ২ আগস্ট ২০২৬ তা ভ্যাকেট করার আদেশ দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে আদালতের নথি ও প্রশাসনিক রেকর্ড বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে ঘটনার প্রকৃত সময়ক্রম ও আইনি অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইনসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা বহাল থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম এমন পর্যায়ে নেওয়া সমীচীন নয়, যাতে তা বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার প্রশ্ন ওঠে। আদালতের আদেশ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা এবং সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন—স্টে বহাল থাকা অবস্থায় ১২ মে চিঠি জারি এবং ১৪ মে গ্রেডেশন শুনানি কোন প্রশাসনিক এখতিয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল? আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে এসব পদক্ষেপের সামঞ্জস্য কতটুকু? আর বিচারাধীন বিষয়ে গ্রেডেশন চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকলে এর পেছনে কারা ছিলেন?
অভিযোগকারীরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট আদালতের নথি, বন বিভাগের চিঠিপত্র, গ্রেডেশন-সংক্রান্ত রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাদের হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠালেও কোন উত্তর মেলেনি।

আপনার মতামত লিখুন :