মোহাম্মদ আলী আবির: ময়মনসিংহে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি’ বাস্তবায়নে প্রায় ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে তৈরি ১৭৪ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ওই তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ময়মনসিংহের সাবেক উপপরিচালক (ডিডি) মো. রোকন উদ্দিন ভূঁইয়াকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাহারে চাপ, চাকরি হারানোর হুমকি এবং পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ থেকে ভোলায় বদলি করা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহ জেলার নজর পড়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন তলব করা হয়েছে।
১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন
সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলার ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ময়মনসিংহের তৎকালীন উপপরিচালক মো. রোকন উদ্দিন ভূঁইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে তিনি ১৭৪ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।
প্রতিবেদনটি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দাখিল করা হয়। ২০২৫ সালের ২৩ জুন প্রেরিত একটি পত্রেও তদন্ত কার্যক্রমের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে ।
২০২৫ সালে দুর্নীতির প্রতিবেদন জমা দিলেও জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বরং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সাথে আদাত করে মন্ত্রণালয় থেকেই ফাইল গায়েব করে দেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছেন। আর এসব সবই হয়েছে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও সচিব মাহাবুব উল আলমের যোগসাজশে।
সূত্রের দাবি, ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের নির্দেশনার ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর আগে তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। পরে চূড়ান্ত পর্যালোচনার জন্য প্রতিবেদনের একটি কপি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক বরাবরে তদন্ত প্রতিবেদনে জমা দিলেও আর মন্ত্রণালয়ে যায়নি। উক্ত প্রতিবেদনও গায়েব হয়ে যায় মর্মে একটি লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই ১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া সুবিধাভোগীর তালিকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নাম, প্রশিক্ষণ না দিয়েই সম্মানী উত্তোলন, বিভিন্ন খাতে অনিয়ম এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা ও দায়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপপরিচালক তদন্ত কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূইয়া।
প্রশিক্ষণ ছাড়াই সম্মানী উত্তোলনের অভিযোগ
অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় বেকার যুবক-যুবতীদের প্রশিক্ষণ না দিয়েই প্রশিক্ষক সম্মানীসহ বিভিন্ন খাতে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এরমধ্যে উপ-পরিচালক ফারজানা পারভিন, ডিডি নুরুজ্জামান চৌধুরীসহ ১১ জন সরাসরি জড়িত। ২০২৩ সাল থেকে ময়মনসিংহ দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক কার্যালয় তদন্ত শুরু করে এখন শেষ হয়নি। কবে শেষ হবে তাও বলা যাচ্ছে না। তবে একটি লিখিত অভিযোগে জানা যায়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও সচিব মাহাবুব উল আলমের নির্দেশে সব ফাইল গায়েব হয়ে যায়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের সাবেক উপপরিচালক ফারজানা পারভীন, সহকারী পরিচালক, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নিজেদের নামে এবং বেনামে বিপুল অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে প্রশিক্ষণ না দিয়েই হাজার হাজার সেশন দেখিয়ে সম্মানী গ্রহণ করা হয়েছে। যেখানে জেলা প্রশাসকের ক্ষেত্রে ১০টি সেশন নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও, উপপরিচালক ফারজানা পারভীনের নামে ২ হাজার এবং সহকারী পরিচালকদের নামে ৫ হাজার করে সেশন দেখিয়ে সম্মানী নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা পর্যায়েও কর্মকর্তাদের নামে হাজারের বেশি ভুয়া সেশন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রশিক্ষকের নামেও কয়েক হাজার ক্লাস দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও সূত্রের দাবি।
ত্রিশালে ২৩২ ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী
ত্রিশাল উপজেলার তদন্তে ২৩২ জন প্রশিক্ষণার্থীকে ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করা হয় বলে জানা গেছে। তাদের নামে উত্তোলন করা প্রায় ৫২ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী ও অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুই দফা তদন্ত ও প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালায়। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাবেক উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া।
পরবর্তীতে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া ২০২৫ সালের ২৩ জুন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে প্রায় ২৯২ কোটি টাকার দুর্নীতি ও হরিলুটের বিষয় উল্লেখ করা হয় । প্রশিক্ষণ না দিয়েও অর্থ উত্তোলনের বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদন দাখিলের পর তদন্ত কর্মকর্তার ওপর চাপ
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিচালক (ডিডি) রোকন উদ্দিন ভূঁইয়ার ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেন সচিব মাহাবুব উল আলম। এমনকি তাকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া এবং চাকরি হারানোর হুমকি দিয়ে ভোলা জেলায় বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে একটি অডিও রেকর্ডিং দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের হাতে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অডিওতে তদন্তকারী কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূঁইয়াকে উদ্দেশ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহাবুব উল আলমের কণ্ঠস্বর বলে দাবি করা ব্যক্তিকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাহারের কথা বলতে এবং ‘কুমিরের সঙ্গে লড়াই না করার’ বিষয়ে সতর্ক করতে শোনা যায়।
অডিওতে আরও একটি বক্তব্য ডিডি রোকন উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি হলেন জলের মাছ, আমি হলাম কুমির।’
তবে অডিওটির কণ্ঠস্বর ও বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সচিবের বক্তব্য জানতে বার বার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
দুর্নীতির অভিযোগের বদলে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা?
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে যাদের নাম বা ভূমিকার কথা উঠে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো তদন্তকারী কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর ডিডি রোকন উদ্দিন ভূইয়া মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। বর্তমানে তিনি ভোলা জেলায় কর্মরত রয়েছেন।
ময়মনসিংহ থেকে ভোলায় বদলি
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই রোকন উদ্দিন ভূঁইয়াকে ময়মনসিংহ থেকে ভোলা জেলায় বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন উপ-পরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া ।
এরপর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি ময়মনসিংহে আসে। কমিটিতে যুগ্ম সচিব আলী রেজা, যুগ্ম সচিব লুলু বিলকিস এবং উপপরিচালক ফরহাদ নূর ছিলেন বলে জানা গেছে। কমিটি ময়মনসিংহে প্রায় চার দিন অবস্থান করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন উপজেলা সফরের আড়ালে আপ্যায়ন, ভোজ ও ভ্রমণের মাধ্যমে তদন্ত কার্যক্রম প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি পূর্ববর্তী তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আর্থিক লেনদেনের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনটির অবস্থান নিয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর সেটি আর পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি নথিতে জমা পড়া একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন কীভাবে পরবর্তী সময়ে অদৃশ্য হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে, তাদের প্রভাবেই প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে কি না—তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—১৭৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে কী তথ্য ছিল, সেটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর কোথায় গেল, কার নির্দেশে বা কার মাধ্যমে তা সরানো হলো এবং তদন্ত কর্মকর্তাকে কেন চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হলো?
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, দুই ভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের পক্ষাবলম্বন করেছেন।
দুর্নীতির বিষয় তুলে ধরার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা, তদন্ত কর্মকর্তাকে চাপ দেওয়া, বদলি এবং চাকরি হারানোর হুমকির পেছনে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহাবুব উল আলমের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একাধিক জেলায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় ময়মনসিংহ, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জ জেলায় একই কর্মকর্তা ডিডি ফারজানা পারভিনের দায়িত্ব পালনকালে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা হরিলুট ও অপচয় করা হয়েছে। তিনি হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগ প্যানেলের অফিসার পরিষদের সাবেক সভাপতি খাইরুলের সহধর্মিনী।
দুদকের নজরে ২৯২ কোটি টাকার অভিযোগ
ময়মনসিংহের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির প্রায় ২৯২ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবার দুর্নীতি দমন কমিশনের নজর পড়ে।
সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন তলব করা হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। এ কারণে দীর্ঘদিনের অভিযোগ এবং কথিত গায়েব হয়ে যাওয়া ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, দুর্নীতির অভিযোগে ময়মনসিংহ জজ আদালতে দায়ের করা মামলা নং-০১/২০২৩-এর ভিত্তিতে বিষয়টি বর্তমানে দুদকের ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ে তদন্তাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ
ন্যায়বিচারের স্বার্থে উপপরিচালক রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পৃথক অভিযোগ দাখিল করায় সচিব মাহাবুব উল আলমসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষেপছেন।
ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও জামালপুরে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আওতায় হওয়া অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে মামলার বাদী খায়রুল আলম রফিক বলেন, এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হয়ে থাকলে তা উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে।
তিনি চলমান তদন্ত কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং জোরদারেরও দাবি জানান।
এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির ২৯২ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে এখন কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—
১. ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃতপক্ষে কী তথ্য ও প্রমাণ ছিল?
২. প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পর বর্তমানে সেটি কোথায়?
৩. সরকারি নথিতে থাকা প্রতিবেদনটি কীভাবে গায়েব হলো?
৪. প্রতিবেদন প্রত্যাহারের জন্য তদন্ত কর্মকর্তার ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল কি না?
৫. তদন্ত কর্মকর্তাকে চাকরি হারানোর হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না?
৬. তদন্ত কর্মকর্তাকে ময়মনসিংহ থেকে ভোলায় বদলির প্রকৃত কারণ কী?
৭. প্রশিক্ষণ না দিয়েই দেখানো হাজার হাজার সেশন ও সম্মানীর অর্থ কোথায় গেছে?
৮. ত্রিশালের ২৩২ ভুয়া প্রশিক্ষণার্থীর প্রায় ৫২ লাখ টাকা ফেরতের সুপারিশ কেন বাস্তবায়ন হয়নি?
৯. একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের মধ্যে অসঙ্গতির কারণ কী?
১০. তদন্ত কার্যক্রমে কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করেছেন কি না?
১১. ময়মনসিংহ, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অভিযোগের ভিত্তি কী?
১২. দুদকের চলমান অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত কী তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে?
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে শুধু প্রশাসনিক তদন্ত নয়, বরং মূল তদন্ত প্রতিবেদন উদ্ধার, প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা, প্রশিক্ষণ সেশন, সম্মানী বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বকাল যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কথিত ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন কোথায় গেল, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় আনা জরুরি। তদন্তকারী কর্মকর্তার ওপর চাপ, হুমকি বা বদলির অভিযোগের সত্যতা থাকলে তারও পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।
ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিতে সরকারি অর্থের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব হওয়ার অভিযোগও এখন গুরুতর প্রশাসনিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাই দুদক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, দায়ীদের শনাক্ত এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

আপনার মতামত লিখুন :