তিতাসে গ্যাস সংকট, আড়ালে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি: অনুসন্ধানে দুদক

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

তিতাসে গ্যাস সংকট, আড়ালে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি: অনুসন্ধানে দুদক

ফাইল ফটো

দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ নিয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং অভিযোগটি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

বর্তমানে দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ১১৪ থেকে ২ হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকরাও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তিতাসের সূত্র জানায়, তিতাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ মিলছে ১৫০ কোটি ঘনফুটেরও কম। বিতরণ নেটওয়ার্কের শেষ প্রান্তে থাকা ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে পাইপলাইনের ছিদ্র ও ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশের ঘটনাও সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই তিতাসের এমডি শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সালে কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজ পেট্রোবাংলায় প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ পান। 

বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত তিন বছরের বিটেক ডিগ্রির ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমমান সনদ (ইকুইভ্যালেন্সি সার্টিফিকেট) দাখিল করা হয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে কর্মরত থেকে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ আরও রয়েছে, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে। প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির ঘটনায় প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৫০০ অবৈধ সংযোগ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায় করা হতো বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

তবে এসব অর্থ আদায়ের সঙ্গে শাহনেওয়াজ পারভেজের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সাগরের অফশোর বিডিং রাউন্ডেও আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিরুৎসাহিত এবং একটি ভারতীয় কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি এবং সহকর্মীদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অভিযোগের তদন্ত হয়েছে। তবে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ বা দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অভিযোগ দিয়েছে এবং সেগুলোর তদন্তও হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা তাঁর জানা নেই বলে জানান তিনি।

এদিকে, শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুদকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অভিযোগটি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাস সংকটের মধ্যে তিতাসের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের একাংশের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!