বনফুল-কিষোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মোতালেবের দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৫, ০২:৩৯ পিএম

মোতালেব সিআইপি তার নাম। তার মালিকানাধীন বনফুল ও কিষোয়ান (মিষ্টি ও বেকারি পণ্য উৎপাদন করে প্রতিষ্ঠানগুলো) গ্রুপের মাধ্যমেই ব্যবসায়ীদের দেওয়া রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ খেতাবটি নিজের দখলে নিয়েছেন তিনি। এছাড়াও তার নামের পাশে যুক্ত হয়েছে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। কারণ ২০১৯ সালে জামায়াতবিহীন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এদিকে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনেছেন মোতালেব। 

নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। শতশত অভিযোগ রয়েছে এই মোতালেবের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে সামনে এসেছে দুবাইয়ে তার দুইশ বাড়ির বিষয়টি নিয়ে এখন আলোচনায়। এদিকে মোতালেবের বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। সংস্থার উর্ধŸতন এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের কাগজ’কে জানান, মোতালেবের আয়কর নথিতে উল্লেখ নেই এমন ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির সন্ধান মিলেছে। বিষটি তদন্তনাধীন থাকায় এর চেয়ে বেশি বলতে চাননি উক্ত কর্মকর্তা। এদিকে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার কারণে ২০২৩ সালে  মোতালেব চাকুরিচ্যুত করেছিলেন বনফুল গ্রুপের মুরাদপুর শাখার সুপারভাইজার মো. শাহাদাত হোসেন মুরাদকে। 

বিষয়টি জানাজানি হলে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এদিকে বার বার স্বচ্ছতার দোহাই দিয়ে ব্যবস্যা করলেও বনফুল-কিষোয়ান ৩ কোটি টাকার ভ্যাট মেরে মামলা খেয়েছেন মোতালেব। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয় কোটি টাকারও বেশি বিক্রির তথ্য গোপনের থাকার বিষয়টি উদঘাটন করেছে সরকারি সংস্থাটি। এদিকে প্রতিদিনের কাগজের অনুসন্ধানী টিম সারাদেশে বনফুল-কিষোয়ান ডিপো-ডিলারদের সাথে কথা বলে ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। এক ডিলার জানান, আমাদের বিক্রির সেল সব চাইতে বাজারে বেশি। ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) বনফুল এন্ড কোম্পানি ও কিষোয়ান স্ন্যাকসের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। 

এর আগে গত ১৭ জানুয়ারি ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতরের একটি টিম বনফুল এন্ড কোম্পানি ও কিষোয়ান স্ন্যাকসের কুমিল্লার দুটি কার্যালয়ে অভিযান চালায়। দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে ওই টিম ভ্যাট ফাঁকির আলামত হিসেবে বিক্রয় চালান ও বিক্রয় রেজিস্টারসহ কয়েকটি কম্পিউটার জব্দ করে। ভ্যাট গোয়েন্দার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বনফুল এন্ড কোম্পানি ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের হিসাব বিবরণীতে বিক্রির পরিমাণ দেখা গেছে ৬ কোটি ৫০ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৪ টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ওই শাখায় কৌশলে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার ২৯ টাকার পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করা হয়েছে। এই বিক্রির ওপর ভ্যাট এসেছে ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৬০ টাকা। 

এই ভ্যাট যথাসময়ে পরিশোধ না করায় ভ্যাট আইন অনুযায়ী মাসিক ২ শতাংশ হারে সুদ হিসেবে প্রাপ্য আরও ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭১৬ টাকা। অন্যদিকে কিষোয়ান স্ন্যাকস ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ কোটি ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ৮৩৪ টাকার পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করেছে।এই বিক্রির ওপর ভ্যাট এসেছে ১ কোটি ৬১ লাখ ২৩ হাজার ৩৭৬ টাকা। এর বাইরে সুদ হিসেবে প্রাপ্য আরও ৯৭ লাখ ২৯ হাজার ৩৩৭ টাকা। সবমিলিয়ে বনফুল ও কিষোয়ানের বিরুদ্ধে মোট ৯ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৬৩ টাকার পণ্য বিক্রির তথ্য গোপন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর। 

 

এবাবদ প্রতিষ্ঠান দুটির ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ৩ কোটি ৩ লাখ টাকারও বেশি। মোতালেব কলেজে পড়াকালীন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, মাঠের রাজনীতিতে তেমন একটা দেখা যায়নি মোতালেবকে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তাকে সহ-সভাপতি করা হয়। জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন সময়ে দলের খরচ জোগানোর জন্য ব্যবসায়ী হিসেবে মোতালেবের নাম প্রস্তাব করেন কয়েকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। ফলে তাকে সহ-সভাপতি করা হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে নিজে নির্বাচন পরিচালনা করে তারই ছোটভাই জামায়াত নেতা মাহমুদুল হককে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। এরপর ২০১৪ সালের শুরুতে তৎকালীন সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু সাঈদকে পদোন্নতি দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি করা হয়, তখন মোতালেবকে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। 

২০১১ সালের দিকে তৎকালীন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুকে মোতালেব কথা দেন তার ছোট ভাইকে জামায়াত বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিয়ে আসবেন। বিনিময়ে তাকে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন করার জন্য দলীয়ভাবে মনোনীত করতে হবে। কথা রাখেন বাবু। মোতালেবকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে সহযোগিতা করেন। কিন্তু মনোনয়ন জমা দেওয়ার বেলায় হারিয়ে যান মোতালেব! সাতকানিয়াকে জামায়াত-শিবির মুক্ত করে চেহারা পাল্টে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া বনফুল গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ মোতালেব সিআইপি এখনো রয়েই গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

 বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের অর্থের অন্যতম যোগানদাতাও ছিলেন তিনি। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে অবস্থান কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগে মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রধান অর্থযোগানদাতা মোতালেব। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে আটক বা গ্রেফতার করতে আগ্রহী নয় তেমন। এদিতে তাকে গ্রেফতার না করায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার একজন ছাত্র প্রতিনিধি প্রতিদিনের কাগজকে জানান, আন্দোলন চলাকালে সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মোতালেবের নেতৃত্বে গত ২০ জুলাই দুপুরে লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি ছিল। ওই অবস্থান কর্মসূচিতে (তৎকালীন) আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও পেট্রোলবোমা নিয়ে হামলা চালান। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হন। 

এদিকে অপারেশন ডেভিল হান্ট চলাকালে সাতকানিয়া- লোহাগড়ার অধিকাংশ আওয়ামীলীগ নেতা এখনো তার তত্ত্ববধানে রয়েছে। একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক বাড়ি ভাড়া করে তিনি আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের আশ্রয় দিয়েছেন। তা ছাড়া দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরীতে আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে এখনো তিনি ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে অবস্থান কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগে মামলা হয়েছে। 

এদিকে তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। পাচারকৃত অর্থে তিনি ডুবাইয়ে দুই শতাধিক বাড়ি কিনেছেন বলে বলে তার একাধিক নিকটজন প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে অন্যান্য দেশেও সম্পত্তির পাহাড় গড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানির নামে অবৈধভাবে তিন হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। এর মধ্যে একাধিক দেশের ব্যাংক এবং ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানে জমা করেছেন হাজারে কোটি টাকা। এছাড়াও আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্কের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে বলে সরকারী একটি সুত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে বিষয়টি তদন্তের উদ্যেগ নিয়েছে দুনীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি সাতকানিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসময়ে তিনি বিএনপি-জামায়াত নেতাদের উপর নির্যাতনের বুল ডোজার চালান। লোহাগাড়া থানায় মামলা করেন মো. ফারুকুল ইসলাম (৩৬) নামের এক ব্যক্তি। বাদী ফারুকুল লোহাগাড়া থানার আধুনগর ইউনিয়নের নূর হোসেন চকিদারপাড়া এলাকার আবুল হাশেমে ছেলে। মামলায় এম এ মোতালেব বাদেও আরও ২৪৭ জনকে এজাহারনামীয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। 

লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান মামলার বিষয়টি প্রতিদিনের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, অভিযোগ পেয়ে মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ২০ জুলাই দুপুরে লোহাগাড়া উপজেলা পরিষদের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি ছিল। ওই অবস্থান কর্মসূচিতে (তৎকালীন) এমপি এম এ মোতালেবের নির্দেশে আসামিরা আগ্নেয়াস্ত্র, ককটেল ও পেট্রোলবোমা নিয়ে হামলা চালান।

এসময় বাদীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি। বনফুল গ্রুপের একাধিক শাখায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মোতালেবের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং প্রতিষ্ঠানীয় নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, তাদের বেতন সময়মতো পরিশোধ করা হয়নি, বরং বিভিন্ন অজুহাতে কাটছাঁট করা হয়েছে। এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোতালেবকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়। তিনি রিসিভ করেনি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Link copied!