জুলাই আন্দোলন দমনে বেপরোয়া ভূমিকার কারণে ব্যাপক সমালোচিত হয় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম মোহাইমেনুর রশিদ। অবশেষে তাকে বদলি হয়।
তার নানা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও বর্বর দমন-পীড়নের তথ্য-উপাত্তসহ দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ পত্রিকায় ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নজরে আসে। পরে শনিবার (২৬ জুলাই) বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ইন্সপেক্টর জেনারেল বিপিএম বাহারুল আলম’র স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পিবিআই এ বদলী করা হয়েছে।
২০২৩ সাল থেকে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশে কর্মরত মোহাইমেনুর রশিদ ‘বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল’ ও ২০২৪ সালে ময়মনসিংহ পুলিশ লাইন হাসপাতাল জাদুঘর বানানোর নেপথ্যের কারিগর বলেও অভিযোগ রয়েছে। ময়মনসিংহ ডিবি ও ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ, সড়কে ট্রাক বসিয়ে চাঁদাবাজি, সিএনজি চালকদের কাছ থেকে অবৈধ মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
গোপন সূত্র জানা গেছে, শুধু ট্রাফিক বিভাগ থেকেই তিনি মাসে প্রায় কোটি টাকা তুলতেন। এমন অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাকে ট্রাফিক বিভাগ থেকে সরিয়ে প্রশাসন বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বেপরোয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম মোহাইমেনুর রশিদ জুলাই আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোতে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে খুশি রাখতে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাইমেনুর রশিদ ভয়ানক রকমের বেপরোয়া ছিলেন। তিনি তখন জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে (ডিবি) পুলিশের দায়িত্বে থেকে বিএনপি-জামাত নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ধরে এনে নানা হয়রানি করেছেন। তার নির্দেশে গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায় থানা পুলিশ, তখন ৩ জন নিহত হয় । এ সময় আহত হয়েছেন পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন। গৌরীপুর থানার ওসি ও তার মোবাইল এবং whatsapp যাচাই করলেই ভয়াবহ তথ্য পাওয়া যাবে।
জানা যায়, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের কলতাপাড়া বাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে কোটা আন্দোলনকারীরা। এ সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত হলে আন্দোলনকারীরা তাদের ওপর ইট-পাটকেল ছুঁড়ে হামলা চালায়। পুলিশ ধাওয়া খেয়ে তাল্লু স্পিনিং মিলের ভেতর আশ্রয় নেয়। মিলের ভেতরে পুলিশের দুটি গাড়িও রাখা ছিল। আন্দোলনকারীরা সেখানে গিয়ে দুই গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখান থেকে পুলিশ বের হওয়ার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় দায়িত্বে ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাইমেনুর রশিদ। তার নির্দেশেই থানা পুলিশ গুলি চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংঘর্ষে পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। আগুনে মিলের বিপুল পরিমাণ তুলা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিস প্রায় ৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। গুরুতর আহত ১৮ জনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তিনজন মারা যান।
এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তিনটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। পাশাপাশি, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আইনজীবী সাইমন রেজা।
এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে এতদিন দায়িত্বে রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, “ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাইমেনুর রশিদকে শুধু বদলি নয়, বরং পুলিশ বিভাগ থেকে বরখাস্ত করে দ্রুত তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
স্থানীয় সাংবাদিকদেরও অভিযোগ, মোহাইমেনুর রশিদের দুর্নীতির প্রতিবাদ করলেই পুলিশের একাংশ দিয়ে তাদের হয়রানি করা হতো। একজন সিনিয়র সাংবাদিক ইতোমধ্যেই জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধান উপদেষ্টার বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :