সহিংসতা ও বিভাজনের রাজনীতি: বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘হেট স্পীচ’ এবং আমাদের উত্তরণের পথ -ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৮ মে, ২০২৬, ০২:১০ এএম

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো পরমতসহিষ্ণুতা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ, চরিত্রহনন এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর একটি মারাত্মক প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সংবাদপত্র, ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা গুগলের পাতা ওল্টালেই রাজনৈতিক নেতাদের কাদা ছোড়াছুড়ি এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের ছড়াছড়ি দেখা যায়। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যাধিকে বৈশ্বিক পরিভাষায় ‘হেট স্পীচ’ (Hate Speech) বা ঘৃণামূলক বক্তব্য বলা হয়। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ছড়ানো এই বিষবাষ্প সমাজকে চরম মেরম্নকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে এর পেছনের কারণ, আšত্মর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং প্রতিকারের উপায়গুলো গভীরভাবে বোঝা জরম্নরি।

১. রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ঘৃণা ছড়ানোর কারণ ও বৈশ্বিক উদাহরণ

ক) বাংলাদেশে এই প্রবণতার কারণ: বাংলাদেশে রাজনৈতিক ঘৃণার এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে :

শূন্য-সমষ্টির রাজনীতি (Zero-Sum Politics): আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে "আমি জিতলে তুমি শেষ, তুমি জিতলে আমি শেষ" এমন একটি মানসিকতা কাজ করে। এই অস্তিত্বের লড়াইয়ের ফলে প্রতিপক্ষকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং 'জাতীয় শত্রু' হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চলে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ও ভিউ-বাণিজ্য: ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো পস্ন্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা যা তীব্র আবেগ, ক্ষোভ এবং উসকানিমূলক কনটেন্টকে দ্রম্নত ছড়িয়ে দেয় (অ্যালগরিদমিক এমপ্লিফিকেশন)। রাজনৈতিক নেতারা ও তাদের কর্মী-সমর্থকেরা লাইক, কমেন্ট ও ভিউয়ের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে চরমপন্থী বক্তব্য বেছে নেন।

বিকল্প ন্যারেটিভ ও জবাবদিহিতার অভাব: যখন মূলধারার রাজনীতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ও সুস্থ চর্চার পথ সংকুচিত হয়, তখন সস্তা আবেগ ও ঘৃণাই হয়ে ওঠে জনসমর্থন ধরে রাখার প্রধান হাতিয়ার।

খ) আন্তর্জাতিক উদাহরণ ও এর ভয়াবহ পরিণতি: ঘৃণামূলক বক্তব্য কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি বর্তমান বিশ্বে একটি বৈশ্বিক মহামারী। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়ানো হেট স্পীচ যখন সমাজকে গ্রাস করে, তার পরিণতি হয় ভয়াবহ।

মিয়ানমার (রোহিঙ্গা গণহত্যা): মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো বছরের পর বছর ধরে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরম্নদ্ধে তীব্র বিষোদগার করে। তারা রোহিঙ্গাদের 'বহিরাগত' এবং 'দেশের জন্য হুমকি' হিসেবে চিত্রায়িত করে। এই সুপরিকল্পিত হেট স্পীচের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ২০১৭ সালের নৃশংস রোহিঙ্গা গণহত্যা এবং জাতিগত নিধনযজ্ঞ।

রুয়ান্ডা (১৯৯৪ সালের গণহত্যা): ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ উদাহরণ রুয়ান্ডা। সেখানে 'রেডিও টেলিভিশন লিবারে ডেস মিল কোলিনস' (RTLM) নামক একটি বেতার কেন্দ্র থেকে রাজনৈতিক নেতারা তুতসি জনগোষ্ঠীকে 'তেলাপোকা' বলে সম্বোধন করতেন এবং তাদের নির্মূল করার উসকানি দিতেন। এই ঘৃণামূলক প্রচারণার মাত্র ১০০ দিনে প্রায় ৮ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল (রাজনৈতিক মেরুকরণ): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ব্রাজিলে জাইর বলসোনারোর মতো পপুলিস্ট (জনরঞ্জনবাদী) নেতাদের বিভেদমূলক বক্তব্য সমাজকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলা এবং ব্রাজিলে ২০২৩ সালের কংগ্রেস ভবনে ভাঙচুরের মতো সহিংস ঘটনা ঘটে।

ভারতে ‘হেট স্পীচ’ রাজনীতি ও এর ভবিষ্যত প্রভাব: ভারতে রাজনৈতিক স্বার্থে উসকানিমূলক ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) ব্যবহারের প্রবণতা ইদানীং আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নির্বাচন বা ভোটের মেরম্নকরণে ধর্মীয়, জাতিগত ও সামাজিক বিভাজনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রায়শই সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। এর ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পরিণতি অত্যন্ত মারাত্মক। প্রথমত, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে দুর্বল করছে। দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তরুণ প্রজন্মকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার ফলে সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা কমে যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এমনকি ভারত রাষ্ট্র ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

২. রাজনৈতিক সংস্কৃতি সংস্কারে করণীয়: এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খোলনলচে বদল আনা প্রয়োজন:

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোড অব কনডাক্ট: প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব আচরণবিধি থাকা উচিত, যেখানে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক শব্দ ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। যারা এই নিয়ম ভাঙবেন, দল থেকে তাদের সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের নজির তৈরি করতে হবে।

জাতীয় সংলাপ ও সমঝোতা: দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। "মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে" এই নীতিতে দলগুলোকে এক টেবিলে বসতে হবে।

নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা: বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষভাবে হেট স্পীচের বিরম্নদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। যে নেতাই ঘৃণা ছড়াবেন, তাকে সামাজিকভাবে বয়কট এবং গণমাধ্যমে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে হবে।

৩. শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি: 

ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠন: ঘৃণামুক্ত সমাজ গঠনে দীর্ঘমেয়াদী এবং সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো শিক্ষা। শিশুদের কচি মনে যদি প্রথম থেকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার বীজ বুনে দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব হবে অনেক পরিশীলিত।

কারিকুলামে 'ডিজিটাল লিটারেসি' ও 'মিডিয়া লিটারেসি' অন্তর্ভুক্তি: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়মাবলী যুক্ত করতে হবে। শিশুরা যেন বুঝতে পারে ইউটিউব বা ফেসবুকে যা দেখা যায় তার সবই সত্য নয়। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তা যাচাই করার মনস্তাত্ত্বিক দক্ষতা (Fact-checking mindset) তৈরি করতে হবে।

সহনশীলতা ও নাগরিক শিক্ষার (Civic Education) প্রসার: পাঠ্যক্রমে এমন গল্প ও কেস স্টাডি রাখতে হবে যা বৈচিত্র্য, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহমর্মিতা (Empathy) শেখায়। ক্লাসরুমে কৃত্রিম 'বিতর্ক প্রতিযোগিতা' বা 'মক পার্লামেন্ট'-এর আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে শিশুরা যুক্তি দিয়ে একে অপরের মতকে খন্ডন করবে, কিন্তু ব্যক্তি মানুষকে আক্রমণ করবে না।

মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন: কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়, একজন শিক্ষার্থী আচরণে কতটা সহনশীল, সহপাঠীদের সাথে কতটা দলগতভাবে কাজ করতে পারছে (Teamwork), তার ওপর ভিত্তি করে নৈতিক শিক্ষার নম্বর বা গ্রেডিং দেওয়া উচিত।

৪. আধুনিক প্রযুক্তির হাতিয়ার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Tools): আজকের ডিজিটাল যুগে শুধু মুখে বলে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত হাতিয়ার বা টুলসের সঠিক ব্যবহার।

হেট স্পীচ প্রতিরোধে তিনটি আধুনিক টুল অত্যন্ত কার্যকর :

প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলা NLP  ডিটেকশন মডেলের মাধ্যমে অনলাইন থেকে আঞ্চলিক গালি ও উসকানিমূলক বক্তব্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা। 

দ্বিতীয়ত, i-Veriy বা বুম বাংলাদেশের মতো ফ্যাক্ট-চেকিং পস্ন্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভাইরাল হওয়া মিথ্যা ও বিকৃত রাজনৈতিক তথ্যের সত্যতা উন্মোচন করা এবং 

তৃতীয়ত, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারি ও নাগরিক সমন্বিত রিপোর্টিং এবং এস্কেলেশন চ্যানেল সক্রিয় রাখা। বুক, ইউটিউবের সাথে সরকারি ও নাগরিক সমন্বিত রিপোর্টিং সিস্টেম।  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাংলা এনএলপি (NLP ): ফেসবুক বা ইউটিউব ইংরেজিতে হেট স্পীচ সহজে ধরলেও বাংলা বা আঞ্চলিক ভাষার উসকানি ধরতে অনেক সময় ব্যর্থ হয়। আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে বাংলা ‘ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং’ মডেল তৈরি করতে হবে, যা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের ভিডিও বা টেক্সট থেকে ঘৃণামূলক শব্দ ও কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্ল্যাগ (Flag) বা চিহ্নিত করতে পারবে।

ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাইকরণ টুলস: ইউএনডিপি (UNDP)-এর iVerify এর মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির আদলে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ এবং জাতীয়স্তরের ফ্যাক্ট-চেক ইঞ্জিন গড়ে তুলতে হবে। কোনো নেতা ভুল বা উসকানিমূলক তথ্য দিলে সাধারণ মানুষ যেন এই টুলের মাধ্যমে সাথে সাথে তার সত্যতা যাচাই করে নিতে পারেন।

৫. আইন ও আইনি কাঠামোর সংস্কার: আইন প্রয়োগের মাধ্যমে হেট স্পীচ নিয়ন্ত্রণ করা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এখানে মনে রাখতে হবে, আইন যেন কোনোভাবেই 'ভিন্নমত দমন' বা 'বাক স্বাধীনতা হরণের' হাতিয়ারে পরিণত না হয়। রাষ্ট্রসংঘের 'রাবাত প্ল্যান অব অ্যাকশন' (Rabat Plan of Action)-এর আলোকেই আমাদের আইনি কাঠামো সাজাতে হবে।

রাবাত প্ল্যান অব অ্যাকশনের মূল কথা: কোনো বক্তব্যকে শাস্তি যোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আগে ৬টি বিষয় যাচাই করতে হবে: বক্তার সামাজিক অবস্থান, উদ্দেশ্য, বক্তব্যের কনটেন্ট, ছড়িয়ে পড়ার পরিধি, তৎকালীন প্রেক্ষাপট এবং এর ফলে অবিলম্বে কোনো সহিংসতা ঘটার আশঙ্কা (Likelihood of harm) আছে কি না।

‘হেট স্পীচ’ এর স্পষ্ট সংজ্ঞা: আইনে "রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য" এবং "গঠনমূলক সমালোচনা" এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে, যেন আইনের অপব্যবহার করে মুক্তচিন্তা বা ভিন্নমত দমন করা না হয়।

আইনের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ করা: অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো আইনগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, যা প্রকৃত হেট স্পীচ বন্ধ করতে পারেনি। আইন এমন হতে হবে যা দল-মত নির্বিশেষে কেবল উসকানিদাতা ও সমাজ ধ্বংসকারীদের বিরম্নদ্ধে কার্যকর হবে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো গেস্নাবাল টেক জায়ান্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে তারা বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় অফিস খোলে এবং বাংলা ভাষার ঘৃণামূলক কনটেন্ট দ্রুত (যেমন: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে) সরিয়ে নিতে বাধ্য থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট' (DSA)-এর আদলে আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে, যেখানে হেট স্পীচ সরাতে ব্যর্থ হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে বড় অংকের জরিমানা করার বিধান থাকবে।

দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি: কোনো নেতা বা ব্যক্তি যদি প্রমাণিতভাবে কারও পরিবার, সন্তান বা গোষ্ঠী নিয়ে কুৎসা রটায় বা দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করে, তবে দলমত নির্বিশেষে তাকে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

পবিত্র কুরবানীর শিক্ষা ও পরমতসহিষ্ণুতা

২০২৬ সালের ঈদ উল আজহার উৎসব সমাগত। ঈদ উল আজহার কুরবানী মানুষকে নিজের ভেতরের পশুত্ব, হিংসা ও অহংকার ত্যাগের শিক্ষা দেয়। সমাজ থেকে হেট স্পীচ নির্মূলে এই ধর্মীয় দর্শনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন মানুষ যখন তার ভেতরের নেতিবাচক প্রবৃত্তিকে কুরবানী করে, তখন তার পক্ষে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ত্যাগের আদর্শই সমাজকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও শান্তিময় করতে সাহায্য করবে।

রাজনৈতিক নেতাদের মুখ থেকে নিঃসৃত উসকানিমূলক শব্দ কেবল প্রতিপক্ষের ক্ষতি করে না, বরং এটি পুরো সমাজের শান্তি ও অগ্রযাত্রাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; এই উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এই বিষাক্ত বাতাবরণ দূর করা অপরিহার্য। কঠোর আইন, উন্নত প্রযুক্তিগত টুলস এবং দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাক্রমের সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে পারি। তবে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজপথের নেতারা যখন অনুধাবন করবেন যে ঘৃণা ছড়িয়ে নয়, বরং যুক্তি, কর্ম ও জনগণের ভালোবাসা দিয়েই স্থায়ী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, ঠিক তখনই বাংলাদেশ একটি বৈষম্যহীন, শান্তিময় ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

লেখক:

জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি

বাংলাদেশ পুলিশ অব:

 

Advertisement

Link copied!