বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও নতুন বাংলাদেশের কঠিন পরীক্ষা -ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৬ মে, ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল কখনোই কেবল একটি দলের বিদায় এবং আরেকটি দলের আগমন নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের চরিত্র, জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার এক গভীর পরিবর্তনের সূচনা। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দলীয়করণ, অর্থনৈতিক সংকট এবং গণতান্ত্রিক সংকোচনের পর বিএনপি যখন জনগণের বড় একটি ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তখন মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশছোঁয়া। কারও কাছে এটি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নতুন ভোর, আবার কেউ দেখছিলেন সতর্ক দৃষ্টিতে—এটি পুরোনো রাজনীতির নতুন রূপ কিনা।

এই বাস্তবতায় বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন কেবল একটি প্রশাসনিক সময়সীমা নয়; বরং এটি ছিল তাদের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের প্রতিশ্রুতির প্রথম বাস্তব পরীক্ষা। এই সময়ের মূল্যায়ন করতে গেলে আবেগ নয়, বরং বাস্তবতা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক প্রত্যাশাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হয়।

স্বস্তির আবহ ও নতুন আশার সূচনা

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ইতিবাচক দিক ছিল দেশে তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী মত দমন, গুম, মামলা এবং মতপ্রকাশের সংকুচিত পরিবেশে সাধারণ মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা জনপরিসরে সরকারের সমালোচনা তুলনামূলকভাবে সহনশীলভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তির অনুভূতি সৃষ্টি করেছে।

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায়ও সরকার কিছু জনমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের সহায়তা, রমজানকেন্দ্রিক বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য আমদানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের মতো পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ এবং ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন ঢাকা’ পরিকল্পনা একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সরকারের ধারণা সামনে এনেছে।

সরকারের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন ২৫ মে ২০২৬-এর সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, মাত্র 100 দিনে সরকার অন্তত 60টি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেগুলোর অধিকাংশ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এই বক্তব্য সরকারের আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন হলেও বাস্তবতার মাপকাঠিতে তার কার্যকারিতা এখনো পুরোপুরি যাচাই হয়নি।

তরুণ প্রজন্মকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক কৌশল

বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। বিএনপি সরকার সেই বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘সীড ফান্ডিং’, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতানির্ভর কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-যুব আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করার যে রাজনৈতিক বার্তা সরকার দিতে চেয়েছে, তা তরুণদের কাছে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তবে নতুন প্রজন্ম কেবল রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না; তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায় যেখানে চাকরি, ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। ফলে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তরুণদের প্রত্যাশাকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা।

প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্নে হতাশা

যদিও সরকারের কিছু উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক, তবে সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে প্রশাসনিক সংস্কারের ধীরগতি নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন, পুলিশ এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যে যে দলীয়করণ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল, জনগণ আশা করেছিল নতুন সরকার অন্তত সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান নেবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্কিত অতীতের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।

মানুষ চেয়েছিল যোগ্যতা, পেশাদারিত্ব এবং নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে। কিন্তু এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পুরোনো সংস্কৃতির উপস্থিতি সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ইতিহাস বলে, জনপ্রিয় সরকারও চাটুকার বেষ্টনী এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে দ্রুত জনসমর্থন হারায়। বিএনপির ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তারেক রহমানের ভিশন বনাম পুরোনো রাজনীতির বাস্তবতা

এই ১০০ দিনের রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত প্রশ্ন হলো—তারেক রহমানের আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে? বিএনপির ভেতরে এখন স্পষ্টত দুটি ধারা দেখা যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে সংস্কারপন্থী ও আধুনিক ধারা, যারা প্রযুক্তি, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলছে। অন্যদিকে রয়েছে ঐতিহ্যগত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, যেখানে এখনো প্রতিহিংসা, অন্ধ আনুগত্য এবং প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি বিদ্যমান।

তারেক রহমান প্রবাসে থেকেও একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা হলো, দলের ভেতরের পুরোনো শক্তিশালী অংশ অনেক ক্ষেত্রেই সেই আধুনিক গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। যদি এই পুরোনো ধারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তবে তা কেবল সরকারের জন্য নয়, বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

ডিজিটাল প্রজন্মের কঠোর প্রশ্ন

আজকের বাংলাদেশে ইউটিউব, ফেসবুক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এখন আর অন্ধ দলীয় আনুগত্যে বিশ্বাস করে না; তারা ফলাফলভিত্তিক রাজনীতি চায়। তারা সরাসরি প্রশ্ন তুলছে—পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে কী করা হচ্ছে? বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোথায়? দুর্নীতি দমন কমিশন কি সত্যিই স্বাধীনভাবে কাজ করছে? ফ্যাসিস্ট মদদপুষ্টদের পদায়ন দৌরাত্ম্য এখনো স্পষ্ট এবং ফ্যাসিস্ট আমলে রাজনৈতিক মতাদর্শের ধুয়া তুলে ক্ষতিগ্রস্তদের মূল্যায়ন না করা এসব গুরুতর বিষয়ে উদাসীনতা ভবিষ্যতের জন্য এটা বিপজ্জনক বার্তা।

এই প্রশ্নগুলো কেবল রাজনৈতিক সমালোচনা নয়; बल्कि রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে জনগণের উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। বিএনপি যদি মনে করে অতীতের নির্যাতনের গল্প শুনিয়ে দীর্ঘদিন জনসমর্থন ধরে রাখা যাবে, তবে সেটি হবে বড় ভুল। বর্তমান প্রজন্ম খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের রায় জানিয়ে দেয়।

পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনীতির কঠিন বাস্তবতা

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের সবচেয়ে জটিল অধ্যায় ছিল পররাষ্ট্রনীতি। সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বললেও বাস্তবে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা এবং ট্রানজিট ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের বিনিয়োগ ও ঋণ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। আবার যুক্তরাষ্ট্র চায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দৃশ্যমান উন্নতি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক কূটনীতি করতে হবে। অতিরিক্ত ভারতবিরোধিতা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি কোনো পরাশক্তির ওপর অতিনির্ভরতাও বিপজ্জনক। ফলে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তববাদী কূটনীতি পরিচালনা করাই সরকারের বড় পরীক্ষা।

জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কঠিন লড়াই

ক্ষমতার প্রথম ১০০ দিন শেষে বিএনপি এখনো জনগণের বড় একটি অংশের আশা ও সমর্থনের জায়গায় রয়েছে। কারণ মানুষ দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যবাদী শাসনের বিকল্প হিসেবে তাদের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলে জনপ্রিয় থাকা আর রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

সাধারণ মানুষ এখন আর কেবল দীর্ঘমেয়াদি ভিশন শুনতে চায় না; তারা প্রতিদিনের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে না আসে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হয় এবং প্রশাসনে দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাব অব্যাহত থাকে, তবে জনপ্রিয়তার ভিত্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়বে।

আত্মসমালোচনার সময় এখনই

সামগ্রিকভাবে বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায় না, আবার একে ঐতিহাসিক সফলতাও বলা যাবে না। এটি মূলত সম্ভাবনা, প্রত্যাশা এবং সতর্ক সংকেতের এক জটিল সন্ধিক্ষণ। কিছু উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক, কিছু বক্তব্য জনমুখী এবং কিছু সিদ্ধান্ত সাহসী। কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কার, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি দমন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের মানুষ এখন কেবল শাসকের পরিবর্তন চায় না; তারা রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন চায়। যদি বিএনপি সময়ের এই বার্তাটি বুঝতে পারে, তবে এই ১০০ দিনের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য এক শক্ত ভিত্তি হতে পারে। অথচ, যদি তারা তা না করে আবারও সেই পুরোনো, পচনধরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুষ্টচক্রে, স্বার্থচালিত চাটুকারদের বেষ্টনীর মিথ্যা বন্দনায় এবং দলীয় অহমিকার চিরায়ত গণ্ডিতে নিজেদের স্থবির করে রাখে, তাহলে ইতিহাস অত্যন্ত নির্মমভাবে আবারও জানান দেবে— ‘বাংলাদেশে কেবল ক্ষমতার মুখোশ ও চরিত্রের বদল ঘটে, কিন্তু শোষণের সমগ্র কাঠামো বিন্দুমাত্র বদলায় না।’ আর এই পচন-ধরা সমগ্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই হবে নব-বাংলাদেশের প্রকৃত ও চূড়ান্ত রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।

লেখক:

-ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ

Advertisement

Link copied!