‘আওয়ামী শাসন আমলের’ ওসিদের ফের গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়ন, ক্ষুব্ধ বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মী

রেজাউল করিম রেজা , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম

ময়মনসিংহ রেঞ্জে বিগত আওয়ামী শাসনামলে দায়িত্ব পালন করা একাধিক পুলিশ পরিদর্শককে (ওসি) আবারও গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অতীতে রাজনৈতিক মামলা ও দমন-পীড়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন কর্মকর্তাদেরই পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দায়ের হওয়া একটি আবেদন বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশ সদরদপ্তর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে ময়মনসিংহ রেঞ্জে প্রায় ৯ হাজার ৩০০টি বিস্ফোরক আইনের মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় প্রায় ৩৭ হাজার ৬০০ বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিএনপি নেতাদের দাবি, মামলাগুলোর বড় অংশই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও “গায়েবি মামলা”।

দলটির নেতারা বলেন, বর্তমানে ময়মনসিংহ বিভাগের যেসব সংসদ সদস্য বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের অনেকেই অতীতে এসব মামলার শিকার হয়েছেন। দীর্ঘ সময় কারাভোগ, আত্মগোপন ও নির্যাতনের মধ্য দিয়েই তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে হয়েছে।

নেত্রকোনা আটপাড়া-কেন্দুয়া আসনের সংসদ সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম হেলালীর নাম উল্লেখ করে স্থানীয় বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে তাকে এবং শতাধিক নেতাকর্মীকে একাধিক বিস্ফোরক ও গায়েবি মামলায় হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নেত্রকোনা জেলা বিএনপির আরও অনেক নেতাকর্মী। তাদের দাবি, ওই সময়ে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল।

ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, তৎকালীন পুলিশ সুপারদের নির্দেশে বিভিন্ন থানার ওসিরা রাজনৈতিক মামলার “কারিগর” হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের ভাষ্য, সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি-মন্ত্রীদের নির্দেশে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়।

বিএনপি নেতাদের দাবি, আওয়ামী শাসনামলে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ জন এমপি এবং ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক রোকনুজ্জামান রোকনসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী গায়েবি মামলা, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেককে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, সম্প্রতি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করা ১৬ জন পুলিশ পরিদর্শককে (ওসি) ময়মনসিংহ রেঞ্জে পুনঃপদায়ন করা হয়েছে। বিষয়টি ঘিরে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

জানা গেছে, এ সংক্রান্ত একটি আবেদন বর্তমানে পুলিশ সদরদপ্তরের তদন্তাধীন রয়েছে। বিএনপির একাধিক নেতার অভিযোগ, আওয়ামী শাসনামলে সুবিধাভোগী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা এখন রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, অতীতে ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত পুলিশ পরিদর্শক আল মামুন সরকার এখনও প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করছেন। তিনি বর্তমানে নেত্রকোনা সদর থানায় ওসি হিসেবে কর্মরত। 

এমনই একজন নান্দাইল ও মুক্তাগাছা থানার সাবেক ওসি আব্দুল মজিদ। সম্প্রতি তাকে কেন্দুয়া থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরে একদিনের মাথায় তাকে আবার পুলিশ লাইন্সে ক্লোজ করা হয়। বর্তমানে তিনি নেত্রকোনা আদালতে ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

বিএনপি নেতাদের দাবি, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনেও ফ্যাসিস্ট সময়ের ওসিদের পুনঃপদায়নের মতো সিদ্ধান্ত বড় কারণ হতে পারে।

ময়মনসিংহ জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুধু ময়মনসিংহ জেলাতেই প্রায় ৮০০ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের মধ্যে অধিকাংশই জামিনে বের হয়ে গেছেন। অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছেন। সেখান থেকে অর্থের প্রভাবে আবারও মাঠ গোছানোর চেষ্টা চলছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পুনরায় সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেছেন। গফরগাঁওয়ের পলাতক সাবেক এমপি বাবেল ও পলাতক সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরিফ আহমেদের নির্দেশ ও অর্থায়নে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের কাজ চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ময়মনসিংহ অঞ্চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত এক সপ্তাহ ধরে এসব কার্যক্রমের প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “গত একবছরে সবচেয়ে বেশি গ্রেফতার হয়েছে ময়মনসিংহ জেলায়। আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কর্মসূচি করছে—এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। জেলা পুলিশ ও ডিবি যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করছে।”

নেত্রকোনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুর রহমান বলেন, “কেন্দুয়া থানায় পুলিশ পরিদর্শক আব্দুল মজিদকে পদায়ন করা হয়েছিল। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারি তিনি আওয়ামী শাসনামলে মুক্তাগাছা ও নান্দাইল থানায় ওসি ছিলেন। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। ওসি পদায়ন আমরা করি না, ডিআইজি স্যারের নির্দেশনায় হয়েছে।”

জামালপুর ও শেরপুর জেলার দুই বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যেসব কর্মকর্তার কারণে বছরের পর বছর বাড়িতে থাকতে পারিনি, তারাই আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসছেন। এটি আমাদের জন্য হতাশাজনক।”

মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা সাজু বলেন, “গত এক সপ্তাহে আওয়ামী লীগের ১৬ নেতাকর্মী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। এরপর থেকে তারা প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা করছে।”

এ বিষয়ে জামালপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, “তারা আদালত থেকে জামিন পেয়েছে। এখন যদি কোনো কর্মসূচি বা অপরাধে জড়ায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” গত ছয় মাসে কতজন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দেখে বলতে হবে।”

কেন্দ্রীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, “গণমাধ্যমে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করছেন। কিন্তু পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।”

ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির এক সদস্য ও বিএনপি নেতা অভিযোগ করেন, “অতীতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা দিতে পুলিশের কোনো সংকোচ ছিল না। অথচ এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে অনীহা দেখা যাচ্ছে।”

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের এক নেতা অভিযোগ করে বলেন, “মামলার ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কেউ অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু হয়রানি বা অর্থ আদায় উদ্বেগজনক।”

তবে এ বিষয়ে ময়মনসিংহের ডিআইজি আতাউল কিবরিয়ার কাছে জানতে বার বার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। whatsapp নাম্বারে বার্তা পাঠিয়েও কোন উত্তর মেলেনি।

Advertisement

Link copied!