ময়মনসিংহ অঞ্চলে ভারতীয় পণ্যের আড়ালে ঢুকছে মাদক

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত দিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। চোরাচালানের মাধ্যমে আনা এসব পণ্য ময়মনসিংহ নগরী থেকে শুরু করে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। আর এসব পণ্যের আড়ালেই দেশে ঢুকছে ভয়ংকর সব মাদকদ্রব্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে শুধুমাত্র মাদকও দেশে প্রবেশ করছে। ফলে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে মাদক। এতে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতীয় চিনি, মসলা, কাপড়, কম্বল, প্রসাধনীসহ নানা পণ্যের পাশাপাশি ফেনসিডিল, হেরোইন ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য সীমান্ত দিয়ে আনা হচ্ছে। এ কাজে চোরাকারবারি চক্র হালুয়াঘাট, দুর্গাপুর-পূর্বধলা-ময়মনসিংহ এবং কলমাকান্দা-নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ রুট ব্যবহার করছে। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও ময়মনসিংহ অঞ্চলে মাদক প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে।

দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত তিন মাসে প্রায় ৯ কোটি টাকার মাদকদ্রব্য এবং প্রায় ৪৫ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য ময়মনসিংহ নগরীসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট থাকলেও মাসিক মাসোহারা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে বড় চালানগুলো আটক হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট চালান আটক করে অভিযান দেখানো হলেও মূল মাফিয়ারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রোডভিত্তিক একটি সূত্র জানায়, “কলমাকান্দা থানার ওসি সবই জানেন। আমরা সামান্য কিছু টাকা পাই, বিনিময়ে তথ্য দেই। কিন্তু বড় অঙ্কের টাকার ভাগ উপরের দিকেই চলে যায়।” ওই সূত্র আরও দাবি করে, শুধু অসাধু পুলিশ সদস্য নয়, কিছু কথিত সাংবাদিকও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। 

নেত্রকোনার এক চোরাচালানকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন থানার সঙ্গে মাসিক মাসোহারা ভিত্তিক যোগাযোগ রয়েছে। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথা বলে ১০ শতাংশ টাকা নেওয়া হয়। তবে আমরা সরাসরি দেই না, ওসিদের মাধ্যমেই দেওয়া হয়।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে বেশি আসে ফেনসিডিল, আর শেরপুর সীমান্ত পথে দেশে প্রবেশ করে হেরোইন। অনেকের দাবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যকর তৎপরতার অভাবেই মাদকের সরবরাহ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতীয় চিনিগুলো সীমান্ত পেরিয়ে বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলের মাধ্যমে দেশে আনা হয়। পরে ভারতীয় বস্তা পরিবর্তন করে দেশীয় বিভিন্ন কোম্পানির মোড়কে ভরে বাজারজাত করা হয়। কয়েক হাত বদল হয়ে এসব পণ্য পৌঁছে যায় জেলার বিভিন্ন বাজারে। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে চিনির দাম বেশি হওয়ায় চোরাকারবারিরা এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।

আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে চোরাচালান চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নিত্যনতুন কৌশলে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে বিভিন্ন পণ্য দেশে আনা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, চিনিসহ বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে ভারতীয় মাদকও দেশে ঢুকছে। তাদের মতে, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা গেলে মাদকের বিস্তার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকার কয়েকটি থানার কিছু অসাধু সদস্য গোপনে মাসিক মাসোহারা ও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চোরাকারবারিদের সুযোগ করে দিচ্ছেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, ময়মনসিংহ নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও চলছে কেনাবেচা। ফলে তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।

তবে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করছে। বিভিন্ন সময় ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, আইস, নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও ইনজেকশন উদ্ধার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ময়মনসিংহ নগরীর বাসিন্দা আজমল হক বলেন, “অধিক লাভের আশায় অনেক চোরাকারবারি ভারতীয় চিনিসহ বিভিন্ন পণ্য ময়মনসিংহে নিয়ে আসছেন। চোরাচালান বন্ধ না হওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। সীমান্তে নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।”

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলে ইয়াবা, হেরোইন ও ইনজেকশনজাতীয় মাদকের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি। অন্য মাদকের ব্যবহার তুলনামূলক কম।

ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা বিভিন্ন সময় আইস, ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও দেশি-বিদেশি মদ উদ্ধার করছে। মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এরপরও অনেক সময় চক্রগুলো নানা কৌশলে মাদক ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এসব ঘটনায় পুলিশ জড়িত থাকলে প্রমাণ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Advertisement

Link copied!