ময়মনসিংহে সরকারি কর্মচারীদের ‘বেগম পাড়া’, দুদকের অনুসন্ধানে শত কোটি টাকার সম্পদ

রেজাউল করিম রেজা , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

সরকারি চাকরির বেতন-ভাতার হিসাব কষলে যা হওয়ার কথা, বাস্তবে যেন তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ময়মনসিংহে। বিভাগীয় শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে একের পর এক আলিশান বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট। আর এসব ভবনের মালিকদের বড় একটি অংশই সরকারি বিভিন্ন  দপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। পুলিশ কর্মকর্তা,  কেরানি, ক্যাশিয়ার, উচ্চমান সহকারী, সার্ভেয়ার, ভূমি কর্মকর্তা, হাসপাতালের কর্মচারী, এমনকি এমএলএসএস ও পিয়ন পদে চাকরি করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও উঠেছে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ।

দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থ লুটপাট ও সরকারি সম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমে কয়েক বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন অন্তত ৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের অনেকেই নিজেদের স্ত্রী বা স্বজনদের নামে গড়ে তুলেছেন বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমিজমা ও বিদেশে সম্পদ।

নগরজুড়ে ‘বেগম পাড়া’র বিস্তার

ময়মনসিংহ নগরীর গোলকিবাড়ি, আকুয়া, আমলাপাড়া, মড়লপাড়া, মাসকান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে অন্তত ৪৯টি আলিশান বহুতল ভবন। আরও শতাধিক ভবনের নির্মাণকাজ চলমান। স্থানীয়দের ভাষায়, এসব এলাকা এখন “ময়মনসিংহের বেগম পাড়া” নামে পরিচিত।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অধিকাংশ ভবনের মালিকানা রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের স্ত্রীদের নামে। কেউ কেউ যৌথ মালিকানায় ৮ থেকে ১৬ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করেছেন। একইসঙ্গে ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ একর জমি ক্রয়ের তথ্যও মিলেছে।

দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এ সংবাদ প্রকাশের পর জনস্বার্থে দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন আবুল খায়ের নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে।

দুদকের একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে অন্তত ৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপুল সম্পদের তথ্য মিলেছে। তাদের মধ্যে অনেকের ব্যাংক হিসাবে শত কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণও পাওয়া গেছে। দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, “ক্যাশিয়ার এনামুল হকের সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়েই আরও অনেকের সম্পদের তথ্য সামনে আসে।”

‘স্বপ্ন টাওয়ার’সহ বহুতল ভবন নিয়ে চাঞ্চল্য : 

সবচেয়ে আলোচিত ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে নগরীর গোলকিবাড়ি এলাকার ১১ তলা “স্বপ্ন টাওয়ার”। এছাড়া আকুয়া হাজীবাড়ি মোড়ে “ইঞ্জিনিয়ারিং টাওয়ার”, “ইব্রাহিম টাওয়ার” ও “ইউলিটি টাওয়ার” নামের আরও কয়েকটি বহুতল ভবন স্থানীয়দের দৃষ্টি কেড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব ভবনের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবৈধ অর্থ। অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্যাশিয়ার মোঃ এনামুল হক ও তার ঘনিষ্ঠ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী যৌথভাবে প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন।

এনামুল হক দাবি করেন, “আমরা ১৮ জন মিলে ২০১১ সালে জমি কিনে ধীরে ধীরে ভবন নির্মাণ করেছি।”

যাদের বিরুদ্ধে উঠেছে সম্পদের অভিযোগ

অনুসন্ধানে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন—

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ক্যাশিয়ার মোঃ এনামুল হক

ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল গনি, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহীন আলম

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম ও 

সাবেক যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা।

এছাড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মচারী ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ রয়েছে।

বিদেশে বাড়ি, সন্তানদের ইউরোপ-আমেরিকায় পড়াশোনা

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কয়েকজন কর্মকর্তা ভারতে, কানাডা ও দুবাইয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি কর্মকর্তা তাপস চন্দ্র রায় ভারতে তিনটি বাড়ি করেছেন। কয়েকজনের সন্তান ইউরোপ-আমেরিকায় পড়াশোনা করছেন এবং পরিবার নিয়ে কানাডায় “সেকেন্ড হোম” গড়েছেন বলেও তথ্য মিলেছে।

সাদেকুল ইসলামের সম্পদ দেখে বিস্মিত অনুসন্ধান টিম

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মচারী সাদেকুল ইসলামসহ ১৬ জনের সম্পদের তথ্য অনুসন্ধান টিমকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা ১৬ জন  নগরীর আমলাপাড়া ও গোলকিবাড়িতে প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ১১ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। 

এছাড়া ৪৫ শতাংশ জমি ও রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ৯ তলা বাড়ির মালিকানা রয়েছে তার পরিবারের নামে। তার প্রথম স্ত্রী সোনিয়া আক্তার অভিযোগ করে বলেন, “আমার স্বামী দুর্নীতির টাকায় এসব সম্পদ করেছেন। প্রতিবাদ করায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।”

দুদক সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক জেলার ও বর্তমান চলতি দায়িত্বে জেল সুপার আব্দুল্লাহ ইবনে তোফাজ্জল হোসেন খানের বিরুদ্ধেও একাধিক বাড়ি ও জমির তথ্য পাওয়া গেছে। নগরীর জামতলা মোড়ে তিনি ৭ তলা ভবন নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, শিক্ষা খাতেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বওলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল বাতেন খান, মুসলিম হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দীন, জেলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক মকবুল হোসেন ও বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধেও যৌথভাবে শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অভিযুক্তদের অনেকেই বিগত সরকারের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে বহাল ছিলেন। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তদন্তের নামে ফাইল বছরের পর বছর ঝুলে ছিল।

Advertisement

Link copied!