পদ্মার প্রবাহে উন্নয়নের মহাকাব্য, মাটির কণায় নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন --- ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬, ১১:০৮ পিএম

পদ্মা, তুমি রূপসী বাংলার হৃৎপিণ্ড। তোমার বুকে ভেসে বেড়ায় পালতোলা নৌকা, তোমার কূলে কূলে কৃষকের গান, জেলেদের জাল, আর কবির কলমে ফোটে অমর সব কবিতা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা পরিণত হয়েছিল এক মরীচিকায়-ভাটায় জল নামতেই জেগে ওঠে ধু-ধু চর, মরে যায় শাখানদী, নোনা জলের থাবায় কৃষিজমি হয় উৎসন্ন। ঠিক এমনই এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি দেশবাসীকে একটি সোনালি স্বপ্ন উপহার দিয়েছিল, যার নাম 'পদ্মা ব্যারেজ'।  আজ সেই স্বপ্ন আর কল্পনার খাতায় বন্দী নেই; একনেক সভায় অনুমোদিত এই মহাপরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পথে। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের এই বাস্তবায়ন যদি সত্যিকারের দূর্নীতিমুক্ত হয়, তবে পদ্মার দুই কূল ছাপিয়ে গোটা দেশের অর্থনীতি, প্রকৃতি ও রাজনীতির মোড় ঘুরে যাবে। আসুন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে জানি, বুঝি-প্রাণের ভাষায়, কবিতার সুরে।   

কেন প্রয়োজন এই প্রকল্প?

পদ্মা আসলে গঙ্গার বাংলাদেশ-অংশ। ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার বুকে পানি থাকে না বললেই চলে।  ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মরুভূমির চেহারা নেয়। গড়াই, মধুমতি, কুমার, নবগঙ্গা, আড়িয়াল খাঁ, ইছামতি, ভৈরব, কপোতাক্ষ-এমন অসংখ্য নদীর নাড়ি ছিঁড়ে যায়। সেচের অভাবে ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির, সুপেয় পানির অভাবে গ্রামের মানুষ পাননির্জন, সুন্দরবনের লোনা পানির আগ্রাসনে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত তো আছেই।   

এই প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা এখানেই: পদ্মার বুকে একটি সুবিশাল ব্যারাজ নির্মাণ করে বর্ষার পানি আটকে রাখা, যা শুষ্ক মৌসুমে নদীমাতৃক বাংলাদেশের শাখা-প্রশাখায় বিতরণ করা হবে। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমি সেচ নিশ্চিত হবে, তেমনি লবণাক্ততা রোধ, মাছের অভয়ারণ্য সৃষ্টি, নৌপরিবহন পুনরুদ্ধার এবং সুপেয় পানির জোগান নিশ্চিত হবে। এ যেন মরুর বুকে পদ্মাকে বেঁধে আনা এক স্থায়ী বর্ষা।

একনেক অনুমোদন: রাজনীতির নতুন প্রভাত

বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে বারবার পদ্মা ব্যারাজের কথা বলেছে। ২০০১ সালের ইশতেহারের 'বাঁচাও দেশ, বদলাও দেশ' শ্লোগানে যেমন ছিল নদী রক্ষার অঙ্গীকার, তেমনি এবারও ক্ষমতায় এসে দলটি প্রথম সুযোগেই একনেক সভায় প্রকল্পটি পাশ করিয়েছে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার রক্ষার প্রতীক। বিরোধীরা যতই সমালোচনা করুক, দেশের কৃষক, জেলে, নারী-সবাই আজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। তবে এই স্বস্তি যেন দূর্নীতির কলঙ্কে মলিন না হয়, সেই প্রত্যাশা সর্বসাধারণের।  স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দাবি জনগণের। কারণ, ইতিহাস বলছে, উন্নয়ন তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন হয়, যখন তার সুফল সরাসরি নদীতীরের গরিব মানুষের ঘরে পৌঁছায়।

পরিবেশগত প্রভাব: কবির ভাষায় প্রকৃতির জয়গান

প্রকৃতি সবসময় তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। পদ্মা ব্যারাজের নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরণের পরিবেশগত পরিবর্তন আনবে-ইতিবাচক এবং কিছু নেতিবাচক প্রভাবও থাকবে। আসুন, প্রথমে ইতিবাচক দিকটুকু কবিতার মায়ায় দেখি:   

"জলের পরশে জাগে যে মাটি,

বুকের ভেতর সবুজ পাটি,

পদ্মা তুমি ব্যারাজ হলে,

ফিরবে বুঝি সোনার আলো মাঠে?"

ব্যারাজের ফলে একটি কৃত্রিম জলাধার তৈরি হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে পার্শ্ববর্তী এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়াবে। যেসব বিল, ঝিল, খাল মরুময় হয়ে উঠেছিল, সেগুলো আবার জেগে উঠবে।  এর ফলে পাখি, মাছ, সরীসৃপসহ বিচিত্র জীবের আবাসস্থল সম্প্রসারিত হবে। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের ভঙ্গুর বাস্তুসংস্থানে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।  ব্যারাজের উজানে সৃষ্ট জলাধার পরিণত হবে পরিযায়ী পাখিদের স্বর্গরাজ্যে। শীতের সকালে রুপালি জলের ওপর সাদা বকের পঙ্খা মেলা দৃশ্য কবি-সাহিত্যিকদের ভাবাবেগ ছাপিয়ে যাবে।   নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও কথা বলতেই হয়। বাঁধের কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা, মৎস্যপ্রজনন ব্যাহত, পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। তবে বিএনপির পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (উওঅ) সম্পন্ন করেই নকশা চূড়ান্ত হবে। নদীর ন্যূনতম প্রবাহ বজায় রাখা, ফিস পাস বা মাছের চলাচলের রাস্তা তৈরি, এবং পর্যাপ্ত পলি নির্গমন ফ্লোর নিশ্চিত করলে ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পাশাপাশি, ব্যারাজ এলাকাকে ঘিরে গড়ে তোলা হবে সবুজ বেষ্টনী-লক্ষ লক্ষ বৃক্ষরোপণ করবে সরকার।  এতে করে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পাশাপাশি মাটিক্ষয় রোধ হবে। প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে উন্নয়ন-এই দর্শনই যেন প্রকল্পের মূলমন্ত্র হয়, সেই প্রত্যাশা করি।

কতোগুলো নদী পাবে প্রাণের জল?

পদ্মা ব্যারাজের সবচেয়ে বড় দান হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৯টিরও বেশি শাখানদী ও খাল-বিলের পুনরুজ্জীবন। মাথাপিছু হিসেব ধরলে নিম্নোক্ত নদীগুলোর নাম আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি:   গড়াই-মধুমতি (যা কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, গোপালগঞ্জের লাইফলাইন), আড়িয়াল খাঁ, নবগঙ্গা, কুমার, চিত্রা, ইছামতি, ভৈরব, কপোতাক্ষ, বেতনা, কাজলা, শিবসা, পশুর নদ, রূপসা, ময়ূর, আপার ভদ্রা-এমন অসংখ্য ছোট-বড় নদী ও খাল পানি পাবে। এতে শুধু কৃষি নয়, এই নদীগুলো নির্ভর মিঠাপানির মৎস্য উৎপাদনও বহুগুণ বেড়ে যাবে।  হারিয়ে যাওয়া নদীপথে আবারও বৈঠা পড়বে, নৌকা চলবে; গ্রামীণ বাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।   

কর্মসংস্থান: শ্রমের বিনিময়ে স্বপ্ন কেনা

ব্যারাজ নির্মাণকালীন প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পরোক্ষভাবে আরও ৫ লাখ মানুষ কাজ পাবে-খাদ্য, বাসস্থান, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, পরিবহন ইত্যাদি খাতে।  কিন্তু প্রকল্পের আসল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে পরবর্তীকালে। সেচসুবিধা সম্প্রসারিত হলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, গড়ে উঠবে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা।  মৎস্যচাষ বাণিজ্যিক রূপ নেবে, হাঁস-মুরগি-গবাদিপশু পালন লাভজনক হয়ে উঠবে। ব্যারাজসংলগ্ন পর্যটন শিল্প ও স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণ আরও লাখ লাখ মানুষের কর্মস্থান তৈরি করবে। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ প্রকল্পের ছত্রছায়ায় জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। ব্যারাজের পাশে আধুনিক মাছের আড়ত, কোল্ড স্টোরেজ, পাটকল, চালকল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠবে। নারীরাও পাবেন সমান সুযোগ-বিশেষ করে হস্তশিল্প, সেলাই, হাঁস-মুরগির খামার, এবং পর্যটনকেন্দ্রে কাজের মাধ্যমে তারা স্বাবলম্বী হবেন। বিএনপি সরকারের পরিকল্পনায় এই কর্মযজ্ঞে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে নদীর মানুষই নদীর উন্নয়নের ফসল ঘরে তোলে।   

পর্যটনের স্বর্গরাজ্য

ভাবুন তো, এক বিশাল জলরাশির বুকে লাল সূর্য ডোবার দৃশ্য! ব্যারাজের গায়ে সাদা ফেনিল জলরাশির গর্জন, আর চারপাশে সুবিন্যস্ত বাগান, ঝুলন্ত সেতু, আলোকোজ্জ্বল পথ-এ এক স্বপ্নিল পর্যটনকেন্দ্র হতে চলেছে পদ্মা ব্যারাজ। প্রকল্পে ব্যারাজের ওপর দিয়ে রাস্তা, ভিউ পয়েন্ট, ইকো-পার্ক, জাদুঘর, শিশুপার্ক, ফুড কোর্ট ও ফ্লোটিং রেস্তোরাঁ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। বিদেশি পর্যটক তো বটেই, দেশের নানা প্রান্তের মানুষ এখানে ছুটে আসবে। ব্যারাজের নিচে মাছের অভয়ারণ্যে স্বচ্ছ পানির নিচের জগৎ দেখার জন্য গ্লাস বটম বোট চালুর কথাও ভাবা হচ্ছে। নৌভ্রমণ, পাখি দেখা, ফটোগ্রাফি-এই সব মিলিয়ে গড়ে উঠবে একটি আন্তর্জাতিক মানের ট্যুরিজম জোন। ফলে স্থানীয় গেস্ট হাউজ, হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হবে। পর্যটন খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিতে আসবে নতুন গতি।   

প্রাণীসম্পদ উন্নয়ন: জলে-স্থলে সমৃদ্ধি

পদ্মা ও তার শাখানদীগুলোর মাছের প্রজাতি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। ব্যারাজ হলে সুবিশাল জলাধার ও সংযুক্ত নদী-খালে মাছের জন্য নিরাপদ অভয়ারণ্য তৈরি হবে। বিশেষ করে ইলিশ, রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, বোয়াল, চিতল, আইড়সহ দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন বেড়ে যাবে।  প্লাবনভূমি-সংশ্লিষ্ট বিলগুলোতে মৎস্যচাষিরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করতে পারবেন। বছরে মাছের উৎপাদন অন্তত ২ থেকে ৩ গুণ বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন। তাছাড়া, সেচের পানির প্রাচুর্যে গোচারণভূমি ও খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়বে, ফলে গরু-ছাগল-মহিষ পালন সম্প্রসারিত হবে। দুগ্ধশিল্প ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানা গড়ে উঠলে পল্লী অঞ্চলের নারীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন।  হাঁস-মুরগির খামারের জন্যও ভুট্টা ও ফিড উৎপাদন ব্যাপকতর হবে। অর্থাৎ, প্রাণীসম্পদ খাতে এক নীরব বিপ্লব সাধিত হবে-যা গ্রামীণ মানুষের পুষ্টি ও আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।   

স্যাটেলাইট সিটি: নদীর বুকে আধুনিক নগর

পদ্মা ব্যারাজকে ঘিরে বিএনপি সরকার একটি 'স্যাটেলাইট সিটি' বা উপগ্রহ নগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। নদীর পাড় ঘেঁষে আধুনিক এই টাউনশিপে বাসস্থানের ব্যবস্থা হবে প্রায় ৫ লাখ মানুষের জন্য। এর মধ্যে থাকবে উচ্চমাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, বিশেষায়িত হাসপাতাল, আইটি পার্ক, শপিং মল, খেলার মাঠ, লেক ও সাইকেল লেন। দুর্যোগ সহনীয় ঘর, সবুজ ছাদ, সোলার প্যানেল ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা-পরিবেশবান্ধব নগরায়ণের এক আদর্শ নমুনা হবে এটি। যে সব পরিবারের জমি ও বাড়ি প্রকল্পের কারণে অর্জিত হবে, তাদের জন্য এই স্যাটেলাইট সিটিতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকছে। তাছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষ, জেলে, কৃষক, শ্রমজীবীদের জন্য থাকবে ভর্তুকিমূল্যের আবাসন। ফলে ব্যারাজ শুধু ইট-সিমেন্টের স্থাপনা নয়, বরং এক নতুন জীবনধারার জন্ম দেবে-নদী আর মানুষের সহাবস্থানের এক মেলবন্ধন।   

রাজনীতির মোহনা: বিশ্বাসের সেতু

এখন আসি সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নে-রাজনৈতিক প্রভাব। পদ্মা ব্যারাজের উদ্যোগটা বরাবরই বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল, এখন পদ্মা ব্যারাজও বিএনপির হাত ধরেই বাস্তবতার পথে। এর মধ্য দিয়ে একটি জাতীয়তাবাদী দল প্রমাণ করছে, তারা ক্ষমতায় এলে শুধু প্রতিশ্রুতি দেয় না, বাস্তবায়নও করে। নদীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এ প্রকল্প ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী-বিরোধে বাংলাদেশের আলোচনার সক্ষমতাও বাড়াবে। ফারাক্কার কড়াল গ্রাস মোকাবেলায় নিজস্ব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার যে কৌশল, পদ্মা ব্যারাজ তার ভিত্তি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদী-কূটনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি হবে।   কিন্তু এসব সুফল তখনই ঘরে উঠবে, যখন প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে দূর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। নদী তীরের মানুষ বারবার বলছে, "আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু লুটপাটের উন্নয়ন না।" বিএনপি যদি সত্যিই জনগণের আস্থা অর্জন করতে চায়, তাহলে বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা অন্য কোনো উৎস থেকে ঋণ হলেও তার প্রতিটি পয়সার হিসাব জনসমক্ষে রাখতে হবে। ঠিকাদারি, মাটি পরীক্ষা, ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ-সবখানেই স্বচ্ছতার আলো ফেলতে হবে। তবেই না এই পদ্মা ব্যারাজ হবে 'জনগণের ব্যারাজ', কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়।   

কবিতার ভাষায় বলি:

"ক্ষমতার জোরে নয়, মমতার ডোরে,

বাঁধো এমন সেতু-বাঁধ, ভাসে যাহা ভোরে,

লক্ষ মায়ের চোখের জলে, বুকের টানে,

পদ্মা ব্যারাজ হবে বটবৃক্ষ মানবের পানে।"

স্বপ্নের পদ্মা, বিশ্বাসের বাংলা

পদ্মা ব্যারাজ আজ আর কোনো দলীয় এজেন্ডা নয়, এটি জাতীয় প্রয়োজনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আড়াই কোটি মানুষের সুপেয় পানি, কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বাস্তুতন্ত্রের পুনর্জাগরণ, পর্যটন, কর্মসংস্থান, আবাসন-সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির আরেক নাম। বিএনপি সরকার এটি নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে বাস্তবায়ন করতে পারলে ইতিহাসে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে জনগণের অংশগ্রহণ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতামত, এবং গণমাধ্যমের অবাধ পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে।   

পদ্মা তার সন্তানদের অপার সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। একসময় ফারাক্কার কষ্টে যে নদী মলিন হয়েছিল, সেই নদীই এখন হতে যাচ্ছে বাঁধনহারা প্রাচুর্যের উৎস। আসুন, সকলে মিলে নিশ্চিত করি-পদ্মা ব্যারাজ হয় স্বচ্ছ, হয় সুন্দর, হয় টেকসই, এবং হয় সর্বজনীন।

রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি:

"নদী তুমি বারবার ফিরিবার পথ পেয়েছ"-পদ্মা, তুমিও ফিরে এসো প্রাণে, ফিরে এসো বাংলার বুকে, ব্যারাজ হয়ে, বরাভয় হয়ে। সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম আমরা-পদ্মাপাড়ের মানুষ, বাংলাদেশের মানুষ।  

 

লেখক:

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান,

অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ।

Advertisement

Link copied!