রামিসার কান্না ও আমাদের বিবেক: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মানবিকতা এবং সমাজের দায় -ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

একটি শিশুর চিৎকার যখন গোটা জাতির আয়না হয়ে ওঠে

রামিসা - নামটি এখন শুধু একটি মেয়ের নাম নয়, এটি একটি প্রতীক। একটি স্কুলছাত্রীর নির্মম ধর্ষণের ঘটনা যখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল, তখন পুরো বাংলাদেশ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সেই স্তব্ধতা কি কেবল একটি ঘটনার শোক, নাকি এটি একটি সমাজের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া?

এই ঘটনায় মানবিকতার একটি আলোকরেখা দেখা গেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রামিসার বড় বোনের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানও দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই মানবিকতার স্ফুলিঙ্গ কি একটি টেকসই পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি কিছুদিন পরে রামিসার মতো আরেকটি নাম আবার আমাদের বিবেককে ঝাঁকুনি দেবে।

পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকানো মুখগুলো

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, প্রতি বছর ধর্ষণের শত শত মামলা নথিভুক্ত হয়, যার অধিকাংশেরই বিচার সম্পন্ন হয় না বছরের পর বছর। এই সংখ্যার পেছনে প্রতিটি রামিসা, প্রতিটি নিপা, প্রতিটি তনু- এরা সংখ্যা নয়, এরা মানুষ। এরা স্বপ্ন দেখত, পরীক্ষার আগের রাতে পড়ত, মায়ের কোলে মাথা রাখত। এই শিশুদের জীবন ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে এবং সমাজের নীরবতা সেই ছেঁড়াকে আরও গভীর করেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ যে বাস্তবতা তা হলো ধর্ষণের ঘটনায় শুধু অপরাধীই দোষী নয়। দোষী সেই পরিবার যারা সামাজিক লজ্জার ভয়ে মামলা করতে দেয় না। দোষী সেই পুলিশ যারা থানায় এউ নিতে ঢিলেমি করে। দোষী সেই বিচারব্যবস্থা যেখানে একটি ধর্ষণ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এবং দোষী সেই সমাজ যেখানে ধর্ষিতা মেয়েকে "কলঙ্কিত" বলা হয়, ধর্ষককে নয়।

আইনের ফাঁক ফোকর: যেখানে ন্যায়বিচার আটকে যায়

বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় কিছু কাঠামোগত সমস্যা আছে যা দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে।

প্রথমত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কিন্তু এই আইন কার্যকর করার যন্ত্রপাতি এখনও দুর্বল। মামলার তদন্ত ত্রুটিপূর্ণ হলে, সাক্ষ্য প্রমাণে গলদ থাকলে, আদালতে মামলা ভেঙে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, ধর্ষণের পর মেডিকেল পরীক্ষার জন্য যে "টু-ফিঙ্গার টেস্ট" এতকাল ব্যবহার হতো, তা বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন এবং ভিকটিমের জন্য অপমানজনক। আদালত এটি নিষিদ্ধ করলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ এখনও দেখা যায়।

তৃতীয়ত, ভিকটিমের পরিচয় সংরক্ষণের বিধান থাকলেও সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়া ঠেকানো যাচ্ছে না, যা ভিকটিমকে দ্বিতীয়বার আঘাত করে।

চতুর্থত, সাক্ষী সুরক্ষার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। গ্রামাঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে চাপ দিয়ে মামলা তুলে নেওয়ানো হয়, সালিশের নামে ধর্ষককে আর্থিক জরিমানায় মুক্তি দেওয়া হয়, আর পরিবার ভয়ে বা অর্থের প্রয়োজনে মেনে নেয়। এটি আইনের পরিপন্থী হলেও এখনও চলছে।

প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার

রামিসার মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে, সেজন্য শুধু কঠোর শান্তির আইন নয়, দরকার একটি সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম।

এক- ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারকে সর্বজনীন করা। দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (OCC) চালু আছে তাত্ত্বিকভাবে, কিন্তু অনেক জায়গায় এটি কার্যত অকার্যকর। এই কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সচল করতে হবে, যেখানে মেডিকেল সহায়তা, আইনি পরামর্শ, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পুলিশ সহায়তা এক ছাদের নিচে পাওয়া যাবে।

দুই - দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালকে সত্যিকার অর্থে দ্রুত করা। আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বিধান আছে, কিন্তু বাস্তবে মামলা চলে বছরের পর বছর। এই ট্রাইব্যুনালে বিচারক সংকট দূর করতে হবে, মামলার পাহাড় কমাতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করতে হবে এবং ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করতে হবে।

তিন - পুলিশ ও বিচার বিভাগে জেন্ডার-সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ। থানায় যে পুলিশ অফিসার ভিকটিমের কথা প্রথম শোনেন, তিনি যদি সংবেদনশীল না হন, তাহলে ভিকটিম আর ফিরে আসবেন না। প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ অফিসার রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চার - শিশু সুরক্ষা আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন। শিশু অধিকার আইন ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ বিধিমালাকে কেবল কাগজে রাখলে চলবে না। স্কুলে স্কুলে শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে এবং শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক রিপোর্টার হিসেবে আইনি দায়িত্ব দিতে হবে।

সমাজের করণীয়: আইন একাই যথেষ্ট নয়

আইন পাল্টালেই সমাজ পাল্টায় না এটি একটি কঠিন সত্য। রামিসার ঘটনায় আমাদের সমাজের যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তা আশাব্যঞ্জক, কিন্তু এই ক্রোধ ও সহানুভূতিকে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে হবে।

ধর্মীয় নেতারা এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রতিটি মসজিদের খুতবায়, প্রতিটি মন্দিরের প্রবচনে যদি নারীর সম্মান ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়, তাহলে সমাজের গভীরে বার্তা পৌঁছায়। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্ব হলো ভিকটিমের পরিচয় ছড়িয়ে না দেওয়া, বরং অপরাধীর বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকা।

তারেক রহমানের উদ্যোগ ও রাষ্ট্রের দায়

রামিসার বড় বোনের দায়িত্ব নেওয়ার যে ঘোষণা তারেক রহমান দিয়েছেন, তা একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংকেত। এটি বলছে যে যৌন সহিংসতার শিকার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কর্তব্য। কিন্তু এই ব্যক্তিগত সহায়তাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দিতে হবে। রাষ্ট্রের উচিত ধর্ষণের শিকার প্রতিটি পরিবারকে আইনি সহায়তা, মানসিক পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রাষ্ট্রীয় প্রকল্প চালু করা।

প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বিচারের আশ্বাস সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ। এখন দরকার সেই সদিচ্ছাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে পরিণত করা যাতে প্রতিটি রামিসার জন্য আলাদা করে আশ্বাস দিতে না হয়, বরং ব্যবস্থাটিই আশ্বাস হয়ে ওঠে।

শেষ কথা: রামিসার চোখের দিকে তাকানো

একটি মেয়ে স্কুলে গিয়েছিল। ফিরে আসেনি যেভাবে গিয়েছিল। তার শৈশব ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার বোন এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে। এই পরিবারের যন্ত্রণা লাঘব করার প্রথম দায়িত্ব রাষ্ট্রের দ্রুত ও নিশ্চিত বিচারের মাধ্যমে।

কিন্তু আমাদের, সমাজের, দায়িত্ব আরও বড়। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে পরের রামিসা যেন না হয়। আইন কঠোর হোক, প্রশাসন সংবেদনশীল হোক, সমাজ সচেতন হোক এই তিনটি স্তম্ভ একসাথে না দাঁড়ালে রামিসার কান্না শুধু একটি ট্রেন্ডিং পোস্ট হয়ে থাকবে, পরিবর্তনের বীজ হবে না।

প্রতিটি শিশু নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার নিয়ে জন্মায়। সেই অধিকার রক্ষা করা আমাদের সকলের- রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার সম্মিলিত দায়িত্ব। রামিসার জন্য ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই এমন একটি বাংলাদেশ- যেখানে এই প্রশ্ন আর তুলতে না হয়।

লেখক:

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ

Advertisement

Link copied!