মরণনেশা মাদক ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র নানা কৌশলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। সীমান্তে কঠোর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরসহ ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ করছে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র। এ কাজে শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ফল, সবজি, মাছসহ বিভিন্ন পণ্যের ট্রাকের আড়ালে মাদক ও অস্ত্র দেশের অভ্যন্তরে পাচার করা হয়। বৈধ অস্ত্র নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টার (বিডিপিসি)-এর তথ্যমতে, দেশে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায় অন্তত ১২৮টি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। দেশে প্রবেশ করা এসব অস্ত্রের বড় একটি অংশ পার্শ্ববর্তী দেশে তৈরি।
র্যাব, বিজিবি ও পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে নিয়মিত অস্ত্র ও মাদকের চালান জব্দ হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তবর্তী বিভিন্ন চোরাইপথ ব্যবহার করে অস্ত্র দেশে আনা হয়। অধিকাংশ অস্ত্র পার্শ্ববর্তী দেশের স্থানীয় ওয়ার্কশপে তৈরি হওয়ায় এগুলো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ অঞ্চলের সীমান্তে অর্ধশতাধিক রুট ব্যবহার করে অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান পরিচালিত হচ্ছে।নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া, এবং শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতি সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি অবৈধ চালান প্রবেশ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গত বছরে বিজিবি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করেছে। জব্দকৃত অস্ত্রের মধ্যে ছিল পিস্তল, রিভলবার, একে-৪৭ রাইফেল, ওয়ান শুটার গান, এয়ারগান, পাইপগান, ম্যাগাজিন, গুলি, ককটেল, বোমা তৈরির উপকরণ ও বিস্ফোরক সামগ্রী। শুধু নভেম্বর মাসেই ১৮টি পিস্তল জব্দ করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো আরও জানায়, দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী চক্র অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। বিদেশ থেকে আনা অস্ত্র সীমান্তবর্তী এলাকা হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফল, সবজি, আখ, পেঁপে, তরমুজ কিংবা অন্যান্য পণ্যের ভেতরে লুকিয়ে অস্ত্র পরিবহন করা হয়। কখনও বাসের সিটের নিচে, স্কুলব্যাগে বা অন্যান্য কৌশল ব্যবহার করেও অস্ত্র পাচার করা হয়।
একইভাবে মাদক চোরাচালানও চলছে বিভিন্ন সীমান্তপথে। বিজিবির তথ্যমতে, গত বছরে ইয়াবা, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ, বিয়ার, গাঁজা, হেরোইন, নেশাজাতীয় ইনজেকশনসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। মাদক ও অন্যান্য চোরাচালানের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কয়েক হাজার ব্যক্তিকে।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় ওপার থেকে বস্তাভর্তি মাদক কাঁটাতারের ওপর দিয়ে এপারে পাঠানো হয়। আবার বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহনের মাধ্যমেও মাদক দেশে প্রবেশ করছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলেন, আধিপত্য বিস্তার, অপরাধ কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রভাব প্রদর্শনের জন্য অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। এসব অস্ত্র ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসী ও অন্যান্য অপরাধী চক্রের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি অবৈধ অস্ত্র ও মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আপনার মতামত লিখুন :