নোয়াখালী জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় আওয়ামী লীগের এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শহীদ শহীদ রিটনের কবরে প্রশাসনের পুষ্প্য মাল্য দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে দেশ জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল ৫ আগস্ট মঙ্গলবার দুপুরে শহীদ রিটনের গ্রামের বাড়ী চরকিং ইউনিয়নের ২২ নং গ্রামের পারিবারিক কবরস্তানে এমন ঘটনা ঘটে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন, হাতিয়া থানা ওসি আজমল হুদা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল বাসেত সবুজ, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফাহাদ হাসান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল জব্বার, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইমরান হোসেন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র পাল সহ উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী,শহীদ রিটনের পরিবারের সদস্য ও পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন কর্মকর্তা ও প্রশাসনের একই আয়োজনে শহীদ রিটনের কবরে পুষ্প্য মাল্য অর্পন করেছেন হাতিয়ার আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর হাতে গড়া চরকিং ইউনিয়নের কথিত রাতের ভোটের চেয়ারম্যান নাইম উদ্দিন আহমেদ। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক।
গত বছর হাসিনা সরকার পতনের পর সারাদেশের ন্যায় হাতিয়া উপজেলার সকল চেয়ারম্যান মেম্বার পলাতক অবস্থায় থাকলে ও এই নাইম উদ্দিন আহমেদ স্ব স্ব অবস্থানে রয়েছেন কে বা কারা তাকে পুর্নবাসন করছে সে প্রশ্ন এখনো অজানা। দিব্যি সকল কাজ করে যাচ্ছেন প্রশাসনের নাকের ডগায়।
আরো জানা যায়, তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ এর শাসন আমলে দলীয় প্রভাব বিস্তার করে ইউনিয়নে বিভিন্ন সরকারি অর্থ অবৈধভাবে আত্মসাৎ সহ এলাকায় লুট ভাংচুর অগ্নিসংযোগ খাল দখল জমি দখল দুর্নীতি সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতন সহ বেপরোয়া চাঁদা বাণিজ্য ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করার অভিযোগ ও রয়েছে।
এই নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে দেখা যায়, কেউ কেউ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সামাজিক সোশ্যাল মিডিয়ায়। কেউ কেউ বলছেন, এটা কি নিছক ভুল? নাকি পরিকল্পিত অপমান? এ নিয়ে দ্বিধা-দোলাচলে রয়েছেন সচেতন নাগরিকরা।
কেউ বলছেন, প্রশাসন হয়তো ভুল গাইডলাইনের শিকার হয়েছে। আবার কেউ বলছেন, পরিকল্পিতভাবে প্রশাসনকে বিতর্কিত করতে মাঠে নেমেছে একটি বিশেষ মহল।
শহীদ রিটনের কবরে পুষ্প্য মাল্য অর্পনের একটি স্পর্শকাতর আয়োজনে কোন ভিত্তিতে এমন বিতর্কিত চরিত্রকে জায়গা দেওয়া হলো? প্রশাসন কি যাচাই-বাছাই ছাড়াই যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধিকে শহীদের স্মরণে আমন্ত্রণ জানায়?
স্থানীয়রা প্রতিদিনের কাগজকে বলছেন, এটি শহীদের রক্তের সঙ্গে তামাশা, এবং ইতিহাসকে পায়ের নিচে দলনের সামিল। শুধু তা-ই নয়, এই ঘটনা শহীদদের প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈকত প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এই একটিমাত্র ঘটনার মাধ্যমে হাতিয়ার মানুষ দেখেছে, শহীদদের স্মৃতি আজ কতটা সস্তায় বিক্রি হয়। দলীয় স্বার্থ, প্রশাসনিক অসতর্কতা আর রাজনৈতিক ছলনায় শহীদের আত্মত্যাগকে যদি এমন তামাশায় পরিণত করা হয়, তাহলে ইতিহাস একদিন নির্মম প্রতিশোধ নেবেই।
শহীদ রিটনের পরিবারের একজন সদস্য প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এটা আমাদের সন্তান শহীদ রিটনের আত্মত্যাগকে প্রকাশ্যে উপহাস করা। প্রশাসন কি এতটাই বোধহীন হয়ে গেছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক নেতা বলেন, এই ঘটনার জন্য হাতিয়া উপজেলা প্রশাসনের কাছে আমরা দ্রুত ব্যাখ্যা চাই। শহীদদের অসম্মান আমরা মেনে নেব না।
এই বিষয়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান নাইম উদ্দিন আহমেদ বলেন, শহীদ রিটন আমার সম্পর্কে ভাগিনা হয়, আমি আরো কয়েকবার গিয়েছিলাম শহীদ রিটনের কবর জেয়ারত করতে। এটা নিয়ে তো ক্ষোভ প্রকাশ করার কিছু নেই।
এই বিষয়ে হাতিয়া থানা ওসি আজমল হুদা প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এই বিষয়ে আমি কিছু জানি না, তবে নাইম চেয়ারম্যান আমাদের সাথে শহীদ রিটনের কবরে পুষ্প্য মাল্য অর্পন করেন নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এই ধরনের ঘটনায় প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত। শহীদের স্মৃতি নিয়ে কেউ যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খেলতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করা দরকার।
এই বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দিন প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, সে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান কিনা সেটাতো আমার জানার বিষয় না। সে ওখানে তার অধিকার চেয়েছে। আমি তো তার স্বাধীনতা হস্তক্ষেপ করতে পারি না। আমাকে তো সরকার সে ক্ষমতা টা দেয় নাই। সরকার যেটা আইন নিয়ে করতে বলেছে সেটুকু করতে পারি। তার বাহিরে তো করতে পারিনা।
সে একজন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান হয়ে সেখানে কিভাবে যায় প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঠিক আছে, সে যাবে কী যাবেনা সেটা একান্তই তার ব্যাপার। সে আমার দ্বারা ইনভাইটেড না, না আমাকে জানিয়ে গিয়েছে। সেটা তার বিষয় সে তো রানিং চেয়ারম্যান তার অধিকার তার কর্ম ক্ষেত্রে তার কিছুতেই কি হস্তক্ষেপ করতে পারি আমি.? যেটাতে আমার প্রতিক্রিয়া নাই, সেটা তার ব্যাপার এটা তো আমার কি করার আছে।
এই বিষয়ে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এটা আসলে দুঃখ জনক বিষয়, এই আয়োজনে অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ যদি উপস্থিত হয়ে থাকে, তাহলে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাইবো।
আপনার মতামত লিখুন :