হাতিয়ার চরগুলোতে ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য: রাতের আঁধারে গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত গ্রামবাসী

মামুন রাফী , নোয়াখালী জেলা সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৪:৩৩ পিএম

নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চর ও তমরদ্দি ইউনিয়নের চরআতাউর এখন যেন আইনশৃঙ্খলার বাইরে এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। প্রতিনিয়ত রাতের বুকে ভয়ঙ্কর গোলাগুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু দল সেখানে আস্তানা গেড়ে দাপট দেখাচ্ছে, আর প্রশাসনের দৃষ্টির সামনেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নেমে গেছে চরম অবনতির দিকে।

গত ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে হাতিয়া উপজেলার নির্বাহী অফিসার বরাবর দেওয়া এক লিখিত অভিযোগপত্রে হাতিয়া শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ তুলে ধরে প্রাণহানির আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের যে প্রত্যাশা ছিল, উন্নত আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার, এই দুই ইউনিয়নের বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

অভিযোগে বলা হয়, জাগলার চর ও চরআতাউর এলাকায় রাত নামলেই আধিপত্য বিস্তারের নামে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে নামে দুটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু গোষ্ঠী। প্রতিটি রাতে গোলাগুলির ঘটনায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গবাদিপশু, জেলে, কৃষক—কেউই নিরাপদ নয়। স্থানীয়রা রাত হওয়ার আগেই ঘরের দরজা বন্ধ করে অন্ধকারে নিঃশব্দে সময় কাটায়, কারণ বাইরে বের হওয়া মানে জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।

জুলাই যোদ্ধারা অভিযোগে উল্লেখ করেন, জুলাই বিপ্লবের পর আমরা ভেবেছিলাম নতুন বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা হবে শক্তিশালী, কিন্তু এই এলাকায় তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় দস্যুরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে।

নিরাপত্তাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এলাকায় নারীরা রীতিমতো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। স্কুলগামী শিশুরা ভয় পাচ্ছে নদীঘাট, মাঠ বা চরের রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে। স্থানীয়দের দাবি—এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তিশালী অস্ত্রধারী গোষ্ঠীগুলো নিয়মিত মহড়া দিচ্ছে।

জুলাই যোদ্ধারা দৃঢ় ভাষায় প্রশাসনের কঠোর ভূমিকার দাবি জানিয়ে বলেন—আমরা আশা করি, ইউএনও মহোদয় এ পরিস্থিতি অবসানে জরুরি ব্যবস্থা নেবেন। নইলে হাতিয়ার এই অংশে বড় কোনো ট্র্যাজেডি ঘটতে সময় লাগবে না।

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করে প্রতিদিনের কাগজকে বলছেন, হাতিয়া সুখচর, জাগলার চর ও চরআতাউরে শান্তি ফিরবে কবে? ভূমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য থামাতে প্রশাসন কি এবার কঠোর হবে? নাকি দ্বীপবাসীর রাতের ঘুম ভাঙবে আরও গোলাগুলির শব্দে?

জাগলার চর এলাকার কৃষক নুরুল হক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, রাত নামলে আমরা আর ঘর থেকে বের হতে পারি না। কখন কোনদিক থেকে গুলি শুরু হয়, বলা যায় না। ফসল দেখভাল করতেও ভয় লাগে। এইভাবে কতদিন চলবে?

চরআতাউর এলাকার গৃহবধূ শিউলি আক্তার প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, আমাদের বাচ্চারা সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে পারে না। গোলাগুলির শব্দ শুনলে বাচ্চারা কাঁদে। মনে হয়, এই গ্রামের ওপর যেন কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা শান্তি চাই।

স্থানীয় জেলে আবদুল কাদের প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, জাল নিয়ে নদীতে যাই, ফিরতে ফিরতে অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু এখন আর সাহস পাই না। দস্যুরা রাতে নদীর পাড়েও ঘোরাঘুরি করে, এমনটা আগে দেখিনি।

তমরদ্দি ইউনিয়নের কলেজছাত্র সোহাগ প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, আমরা পড়ালেখা করে ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু এলাকার এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি। কখন কোন সংঘর্ষ লেগে যায়, জীবনেরই নিরাপত্তা নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, ৫৫ বছর ধরে এই গ্রামে আছি। এমন ভয়ঙ্কর রাত কখনো দেখিনি। দুষ্কৃতকারীরা শক্তিশালী হয়ে গেছে। প্রশাসন কঠিন ব্যবস্থা না নিলে বড় বিপদ ঘটবে।

এই বিষয়ে হাতিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দিন অভিযোগপত্রে উত্থাপিত বিষয়গুলোকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে প্রতিদিনের কাগজকে বলেন—সুখচর ও চরআতাউর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন—গোলাগুলি, দস্যুতাসহ যেকোনো ধরনের সশস্ত্র সংঘর্ষ বরদাস্ত করা হবে না। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব, এবং আমরা সেই দায়িত্ব পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। খুব শিগগিরই এসব এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

নাগরিকদের প্রতি আশ্বস্ত করে তিনি আরও বলেন, জনগণ ভয় না পেয়ে প্রশাসনকে সঠিক তথ্য দিন। ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্র যত শক্তিশালীই হোক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কেউ অজেয় নয়। হাতিয়ার সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।

Advertisement

Link copied!