পুলিশে পদোন্নতির স্থবিরতায় হতাশ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণরা

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:১৮ এএম

খায়রুল আলম রফিক: বাংলাদেশ পুলিশে নিয়োগ ও পদোন্নতির কাঠামোয় দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও স্থবিরতা নিয়ে ক্রমেই বাড়ছে অসন্তোষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিআরবি (Police Regulations of Bengal) মোতাবেক বাংলাদেশ পুলিশে তিন স্তরে নিয়োগ হয়ে থাকে— কনস্টেবল, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত আউটসাইড ক্যাডেট এসআই এবং বিসিএস ক্যাডার এএসপি।

একই সময়ে চাকরিতে যোগ দিয়ে ট্রেনিং শেষ করার পর ২৫ বছরের কর্মজীবনে একজন কনস্টেবল ও একজন এএসপি যেখানে ৪ থেকে ৫টি পদোন্নতি পেয়ে যথাক্রমে পুলিশ পরিদর্শক/এএসপি এবং ডিআইজি বা অতিরিক্ত আইজি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন, সেখানে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত আউটসাইড ক্যাডেট এসআইদের অধিকাংশই ২৫ বছরে মাত্র একটি পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হিসেবেই থেকে যান।

অভিযোগ রয়েছে, একজন আউটসাইড ক্যাডেট এসআই ১১–১২ বছরে একটি পদোন্নতি পেলেও একই সময়ে একজন কনস্টেবল দুটি পদোন্নতি পান এবং এএসপি একই সময়ে দুটি পদোন্নতি পেয়ে এসপি হন। কিন্তু সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এসআইদের ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকে না। ফলে অধিকাংশ ইন্সপেক্টর একটি মাত্র পদোন্নতি নিয়েই চাকরি থেকে অবসরে যাচ্ছেন।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এসআইরা কর্মজীবনে একটির বেশি পদোন্নতি না পাওয়ায় তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে দায়িত্ব পালনে আগ্রহহীনতা, পেশাগত শৈথিল্য এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির ঝুঁকিতেও। পরিবার, সমাজ ও আত্মীয়স্বজনের কাছেও তারা মানসিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, সরকার পরিবর্তনের সময় উর্ধ্বতন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির হিড়িক দেখা গেলেও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ইন্সপেক্টরদের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যায়। অথচ মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে অভিজ্ঞতার দিক থেকে তাদের সক্ষমতা অনেক বেশি। তবুও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ।

একাধিক সূত্রের দাবি, বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট গঠন ও সুপার নিউমারারি পদ্ধতির উদ্ভাবন করা হলেও ইন্সপেক্টরদের জন্য কার্যকর কোনো কাঠামো তৈরি হয়নি। তদারকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা উর্ধ্বতন ক্যাডার কর্মকর্তাদের হাতে থাকায় ইন্সপেক্টরদের দাবিগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে না।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকারি অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পদোন্নতিজনিত গ্রেড সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও পুলিশের ইন্সপেক্টররা বৈষম্যের শিকার। ১৭–১৮ বছর নবম গ্রেডে ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর পদোন্নতি পেয়ে এএসপি হলেও অনেক ক্ষেত্রে একই গ্রেডেই আটকে থাকতে হয়।

সূত্র জানায়, পুলিশ পরিদর্শক পদে উন্নীত হওয়ার পর প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা একই পদে থেকেই অবসরে যান। বাকি ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে পদোন্নতি হলেও তা অধিকাংশ সময় অবসরের একেবারে শেষ পর্যায়ে হওয়ায় বাস্তব কোনো সুফল পাওয়া যায় না। ফলে পেশাগত অগ্রগতি, মর্যাদা ও প্রণোদনার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুলিশে যোগদান নিয়ে হতাশা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ বাহিনীর পেশাগত উন্নয়ন ও মনোবল ধরে রাখতে পদোন্নতির বাস্তব ও ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে পুলিশে মেধাবী তরুণদের আগ্রহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Link copied!