দেশজুড়ে দুর্নীতি, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে কিশোরগঞ্জে নতুন এক চাঞ্চল্যকর চক্রের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও নাহিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিল্পপতি বাবু ঝন্টু কুমার সাহা এবং তার সহযোগী পিতা-পুত্র আনোয়ার হোসেন ও ফয়সাল হোসেনের বিরুদ্ধে ৫৭৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, টাকা পাচার এবং কর্মচারীদের আটকে নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়েছে।
ঢাকা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাবেক কর্মচারী হাসিবুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন। বাবু ঝন্টু কুমার সাহা কিশোরগঞ্জ-৫ বাজিতপুর-নিকলী আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থীও ছিলেন। এলাকায় তিনি দানবীর হিসাবেও পরিচিত।
দুদকের ২০২৪ সালের তদন্তে দেখা গেছে, “নাহিদ এন্টারপ্রাইজ” ও “পিংক প্লাস্ট” নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ভুয়া ভ্যাট চালান তৈরি করে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক দানা আমদানি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্বে প্রায় ৫৭৫ কোটি টাকার ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, চক্র দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া ব্যবসায়িক নথিপত্র তৈরি করে আমদানি-রপ্তানির নামে অবৈধ অর্থ উপার্জন করে আসছিল।
কর্মচারীদের নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল:
ভুয়া কাগজপত্র ফাঁস হওয়ার সন্দেহে প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মচারী মোঃ হাসিবুল হাসান ও তার ভাইকে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়েছে এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। পাশাপাশি তাদের পারিবারিক সম্পত্তি দখল করে নেওয়া হয়েছে এবং একাধিক মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার বর্তমানে প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে আত্মগোপনে রয়েছে।
বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ:
প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, বাবু ঝন্টু কুমার সাহা ও আনোয়ার-ফয়সাল চক্র ঢাকায় কমপক্ষে ২৪টিরও বেশি বাড়ি ও জমির মালিক। এসব সম্পদ অর্জিত হয়েছে অবৈধ ভ্যাট ফাঁকি ও দুর্নীতির মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং রাজনৈতিক নেতাদের ঘুষ দিয়ে এই চক্র তাদের অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে এসেছে।
ঘুষ বাণিজ্য ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া:
তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন ঢাকা-৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাজী সেলিম, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনসহ আরও অনেকে। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও বিপুল অঙ্কের ঘুষ দেওয়া হয়েছে। ঘুষ গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছে লালবাগ থানার সাবেক ওসি, সহকারী কমিশনার ও কিছু রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত সহকারী।
অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার ফোন করা হলেও ঝন্টু কুমার সাহা ফোন রিসিভ করেননি। উপরিউক্ত চক্রের কর্মকাণ্ড শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি দেশের প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং আইনের শাসনের অভাবের একটি ভয়াবহ উদাহরণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দুদকের কার্যকর ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমেই কেবল এই চক্রকে বিচারের মুখোমুখি আনা সম্ভব।
আপনার মতামত লিখুন :